সাধারণ মৌসুমি ফ্লু অনেক সময় কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল পান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণে বেশির ভাগ মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এত সহজ থাকে না। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৌসুমি ফ্লু থেকে দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া, সেপসিস এমনকি প্রাণঘাতী জটিলতাও।
একজন বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে সাধারণ ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া, পরে রক্তে সংক্রমণ এবং শেষ পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ার ঘটনা এই ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠতে পারে, পরিচিত এই অসুখ কখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি?
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণকে সাধারণভাবে ফ্লু বলা হয়। এতে হঠাৎ জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ মানুষ কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু ফ্লুকে সব সময় নিরীহ অসুখ ভেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
ফ্লু থেকে জটিলতা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সংক্রমণের প্রভাবে শ্বাসতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়া। এর ফলে ফুসফুসে ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া হতে পারে। আবার সংক্রমণের পর শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়ে সেপসিস তৈরি করতে পারে। সেপসিস হলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াজনিত একটি গুরুতর অবস্থা, যা বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। ফ্লু-সম্পর্কিত জটিলতায় কখনো কখনো হৃদ্যন্ত্রের প্রদাহ, মস্তিষ্কের প্রদাহ কিংবা গুরুতর শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি বা নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে।
তবে সবার ক্ষেত্রে এমন জটিলতা হয় না। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হাঁপানি, সিওপিডি, হৃদ্রোগ, কিডনির রোগ বা ক্যানসার রয়েছে, তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এমন ওষুধ গ্রহণকারীদেরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মৌসুমি ফ্লু হলে আতঙ্কিত হয়ে নিজে থেকে একাধিক ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অপ্রয়োজনীয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার পর শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা জ্বর ও কাশি কমার পর আবার বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। শিশুদের দ্রুত বা কষ্ট করে শ্বাস নেওয়া এবং বয়স্কদের হঠাৎ খুব দুর্বল হয়ে পড়াও বিপদের সংকেত হতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অসুস্থতার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। জ্বরের কারণে খাবার কম খাওয়া বা পানিশূন্যতা তৈরি হলে রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করতে পারে। তাই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধ করা যাবে না।
মৌসুমি ফ্লু প্রতিরোধে নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বাড়িতে থাকার চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজন হলে জনসমাগমে মাস্ক ব্যবহার করাও সহায়ক।
ফ্লু প্রতিরোধে টিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া উপকারী হতে পারে। টিকা সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকাতে না পারলেও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, মৌসুমি ফ্লু মানেই বড় বিপদ নয়, কিন্তু একে অবহেলা করাও ঠিক নয়। উপসর্গের পরিবর্তন খেয়াল রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের বাড়তি যত্ন নেওয়া এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই গুরুতর জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন