ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যু কমাতে টিকা ব্যবহারের বিষয়ে বড় সিদ্ধান্তের পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে, পাশাপাশি আরও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বিশ্বে থাকা ডেঙ্গু টিকার সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এখনই দেশজুড়ে ডেঙ্গুর টিকাদান শুরু হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেছে সরকার।
এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা ও দেশের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে কোনো টিকা ব্যবহারের আগে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, বয়সভিত্তিক ব্যবহার এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য উপযোগিতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। সরকারের এই অবস্থানকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে গবেষণাও ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তৈরি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন TV005 নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করেছেন। গবেষকদের মতে, টিকাটি ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এখন বাংলাদেশে এই টিকার তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর চেষ্টা চলছে।
ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে সরকারের আগ্রহ বাড়ার পেছনে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের সব ধরনের ভ্যারিয়েন্ট বা সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকা এলেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
সরকার বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও জোরদার করছে। দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার চিকিৎসককে হালনাগাদ ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসকদের জন্য ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ও বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে ডেঙ্গুর টিকা সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হবে। তাই এখনই টিকা পাওয়ার আশায় মশা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত সতর্কতায় শিথিল হওয়ার সুযোগ নেই। গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পরামর্শের ফল ইতিবাচক হলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় টিকা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন