ঢাকা ০৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo শিশুর শরীরে কালো দাগ কেন হয়? অ্যাকাথোসিস নিগ্রিক্যানস ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জানুন Logo আয়োকিগাহারা ফরেস্ট: জাপানের রহস্যময় ‘সুইসাইড ফরেস্ট’ এর অজানা সত্য Logo মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার ইঙ্গিতে তেলের দামে নিম্নগতি Logo ইরানের সঙ্গে সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্পের ইঙ্গিত Logo প্রথম সপ্তাহেই ঝড়, উত্তর আমেরিকায় বাড়ছে ‘দম’ এর দাপট Logo ইরান সংকট খাদ্য নিরাপত্তা: সারের বাজারে নতুন বৈশ্বিক চাপ Logo চন্দনাইশে মখলেছুর রহমান চৌধুরী-আলতাজ খাতুন স্কুলে পুরস্কার বিতরণ ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় Logo চুক্তিতে না এলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র: পেন্টাগনের সতর্কবার্তা Logo আপনার লোকেশন ট্র্যাক করছে স্মার্টফোন! বন্ধ করবেন যেভাবে Logo ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা আলোচনা নিয়ে যা জানাল পাকিস্তান, কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে

ইরান সংকট খাদ্য নিরাপত্তা: সারের বাজারে নতুন বৈশ্বিক চাপ

  • Taslima Khanom
  • Update Time : ১২:২১:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫০৭

চিত্রঃ ইরান সংকটের প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা সংকট

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতা এখন শুধু একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি, কৃষি ব্যবস্থা এবং খাদ্য সরবরাহে বড় চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সাধারণ মানুষের থালায়। কারণ যুদ্ধের অভিঘাত প্রথমে বাজারে লাগে, পরে তা পৌঁছে যায় রান্নাঘরে। মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদক অঞ্চল। একই সঙ্গে রাসায়নিক কাঁচামাল, শিল্প উপাদান এবং সারের উপকরণ সরবরাহেও এ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলের সমুদ্রপথে বাধা তৈরি হলে তেল, গ্যাস ও বাণিজ্যিক পণ্যের প্রবাহ কমে যায়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রব্যমূল্য দ্রুত বেড়ে ওঠে।

বিশ্বের অধিকাংশ রাসায়নিক সার তৈরিতে প্রাকৃতিক গ্যাস বড় ভূমিকা রাখে। গ্যাসের দাম বাড়লে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া এবং অন্যান্য সারের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ইরান সংকটের কারণে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সারের বাজারও কেঁপে উঠেছে। অনেক দেশ আগাম মজুত বাড়াতে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিভিত্তিক দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে।কারণ এসব দেশের কৃষকরা ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষে আমদানিকৃত সারের ওপর নির্ভরশীল। সারের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে ছোট কৃষকের পক্ষে আগের মতো জমি চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা কম জমিতে চাষ করেন, কিংবা কম ফলনশীল বিকল্প পথে যেতে বাধ্য হন।

আফ্রিকার বহু দরিদ্র দেশেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সেখানে কৃষকরা আগে থেকেই খরা, পানি সংকট ও দুর্বল অবকাঠামোর সঙ্গে লড়ছেন। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয়ের নতুন বোঝা। ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, কৃষকের সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে। অনেকে বেশি সার লাগে এমন ফসল ছেড়ে কম খরচের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এতে সাময়িকভাবে খরচ কমলেও বাজারে চাল, গম বা ভুট্টার সরবরাহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্যদ্রব্যের দামে বড় অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন দরকার। ডালজাতীয় শস্য, তেলবীজ, কম সারনির্ভর ফসল এবং মাটির উর্বরতা  রক্ষাকারী চাষ বাড়াতে হবে। স্থানীয় জৈব সার, কম্পোস্ট, গোবর ও কৃষি বর্জ্য ব্যবহারে গুরুত্ব দিলে আমদানি নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থা কৃষকের খরচ কমাতে সহায়ক হতে পারে। সরকারগুলোকেও এখন কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সারের ভর্তুকি, কৃষিঋণ সহায়তা, ন্যায্যমূল্যে বীজ সরবরাহ এবং খাদ্য মজুত জরুরি। বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত আমদানি ব্যবস্থাও প্রয়োজন। নইলে উৎপাদক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হবে।

বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান কাঠামো দেখিয়ে দিয়েছে, এক অঞ্চলের সংঘাত সবার সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান সংকট তার বড় উদাহরণ, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র দূরে হলেও প্রভাব ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। জ্বালানি বাজারের ধাক্কা সারের বাজারে লাগে, সেখান থেকে তা খাদ্যের দামে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবারই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে এবং উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা আরও নড়বড়ে হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যসংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ইরান সংকট এখন শুধু রাজনীতির বিষয় নয়, মানবজীবনেরও বড় প্রশ্ন।

জনপ্রিয় সংবাদ

শিশুর শরীরে কালো দাগ কেন হয়? অ্যাকাথোসিস নিগ্রিক্যানস ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জানুন

ইরান সংকট খাদ্য নিরাপত্তা: সারের বাজারে নতুন বৈশ্বিক চাপ

Update Time : ১২:২১:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতা এখন শুধু একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি, কৃষি ব্যবস্থা এবং খাদ্য সরবরাহে বড় চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে সাধারণ মানুষের থালায়। কারণ যুদ্ধের অভিঘাত প্রথমে বাজারে লাগে, পরে তা পৌঁছে যায় রান্নাঘরে। মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদক অঞ্চল। একই সঙ্গে রাসায়নিক কাঁচামাল, শিল্প উপাদান এবং সারের উপকরণ সরবরাহেও এ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলের সমুদ্রপথে বাধা তৈরি হলে তেল, গ্যাস ও বাণিজ্যিক পণ্যের প্রবাহ কমে যায়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রব্যমূল্য দ্রুত বেড়ে ওঠে।

বিশ্বের অধিকাংশ রাসায়নিক সার তৈরিতে প্রাকৃতিক গ্যাস বড় ভূমিকা রাখে। গ্যাসের দাম বাড়লে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া এবং অন্যান্য সারের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ইরান সংকটের কারণে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সারের বাজারও কেঁপে উঠেছে। অনেক দেশ আগাম মজুত বাড়াতে গিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিভিত্তিক দেশগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে।কারণ এসব দেশের কৃষকরা ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষে আমদানিকৃত সারের ওপর নির্ভরশীল। সারের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে ছোট কৃষকের পক্ষে আগের মতো জমি চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা কম জমিতে চাষ করেন, কিংবা কম ফলনশীল বিকল্প পথে যেতে বাধ্য হন।

আফ্রিকার বহু দরিদ্র দেশেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সেখানে কৃষকরা আগে থেকেই খরা, পানি সংকট ও দুর্বল অবকাঠামোর সঙ্গে লড়ছেন। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয়ের নতুন বোঝা। ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, কৃষকের সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে। অনেকে বেশি সার লাগে এমন ফসল ছেড়ে কম খরচের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এতে সাময়িকভাবে খরচ কমলেও বাজারে চাল, গম বা ভুট্টার সরবরাহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্যদ্রব্যের দামে বড় অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন দরকার। ডালজাতীয় শস্য, তেলবীজ, কম সারনির্ভর ফসল এবং মাটির উর্বরতা  রক্ষাকারী চাষ বাড়াতে হবে। স্থানীয় জৈব সার, কম্পোস্ট, গোবর ও কৃষি বর্জ্য ব্যবহারে গুরুত্ব দিলে আমদানি নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থা কৃষকের খরচ কমাতে সহায়ক হতে পারে। সরকারগুলোকেও এখন কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সারের ভর্তুকি, কৃষিঋণ সহায়তা, ন্যায্যমূল্যে বীজ সরবরাহ এবং খাদ্য মজুত জরুরি। বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত আমদানি ব্যবস্থাও প্রয়োজন। নইলে উৎপাদক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হবে।

বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান কাঠামো দেখিয়ে দিয়েছে, এক অঞ্চলের সংঘাত সবার সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান সংকট তার বড় উদাহরণ, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র দূরে হলেও প্রভাব ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। জ্বালানি বাজারের ধাক্কা সারের বাজারে লাগে, সেখান থেকে তা খাদ্যের দামে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবারই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে এবং উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা আরও নড়বড়ে হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যসংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ইরান সংকট এখন শুধু রাজনীতির বিষয় নয়, মানবজীবনেরও বড় প্রশ্ন।