হাম পরিস্থিতি সিলেট নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে বিভাগজুড়ে হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৬৯ শিশু এবং এক নার্সের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালে ভর্তির হার বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৩২২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী সুনামগঞ্জ জেলার। এছাড়া সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে। হবিগঞ্জে হামের পাশাপাশি কয়েকজন রুবেলা রোগীও শনাক্ত হয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হাম পরিস্থিতি সিলেট অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে শিশুদের ওপর। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। হাম সাধারণত একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, অপুষ্টি এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু আগে থেকেই দুর্বল স্বাস্থ্য অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্য এই রোগ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৮০ জন রোগী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়া শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল এবং বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও রোগী ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২৯৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল, শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল এবং মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ভর্তি রয়েছেন। রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে এ রোগের সংক্রমণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে অনেক ক্ষেত্রে টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এজন্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগমুক্ত নয়। চলতি বছরে হাম ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭০-এ পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৬৯ জন শিশু এবং একজন নার্স রয়েছেন। মৃত্যুর এই সংখ্যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। সাধারণত জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া হামের প্রধান লক্ষণ। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
হাম পরিস্থিতি সিলেট জুড়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, শয্যা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, রোগীর সংখ্যা বাড়লেও যাতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত না হয়, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম জানিয়েছেন, হাম ও নিউমোনিয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
হাম পরিস্থিতি সিলেট নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাসময়ে টিকাদান, দ্রুত চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এজন্য স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সবার সচেতন অংশগ্রহণ থাকলে সংক্রমণের বিস্তার কমানো এবং প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


























