ঢাকা ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু: তিন হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচল না ৫ মাস বয়সী তাকরিম

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৫:০০:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • ৫৩০

হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৫ মাস বয়সী তাকরিমের মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছেন স্বজনেরা।

হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু নিয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা। তিন হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো গেল না ৫ মাস বয়সী তাকরিমকে। ভুল শনাক্তকরণ, নিউমোনিয়া ও জটিলতায় মৃত্যু হয় শিশুটির।হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু আবারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ে। ভোলা জেলার ৫ মাস বয়সী শিশু মো. তাকরিমকে বাঁচাতে এক মাস ধরে লড়াই করেছেন তাঁর মা-বাবা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল ঘুরেও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি তাঁরা। হাম, নিউমোনিয়া ও একাধিক জটিলতায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যায় ছোট্ট তাকরিম।

শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালের করিডোরজুড়ে কান্নার পরিবেশ তৈরি হয়। মা আমেনা বেগম বারবার বিলাপ করছিলেন, “আমি তো বাবারে বুকে কইরা আনছি, এখন কেমনে ফালাইয়া যামু।” তাঁর কান্নায় উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ভোলার সদর হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়। জ্বর, কাশি ও শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলেও চিকিৎসকেরা প্রথমে এটিকে অ্যালার্জি হিসেবে শনাক্ত করেন। শিশুটির বাবা মো. মহসীন জানান, তিনি বহুবার চিকিৎসকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন এটি হাম কি না। কিন্তু তাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা হয়নি।

সময়ের সঙ্গে তাকরিমের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। পরে তাকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি হাম ও হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে পিআইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ বেড না পাওয়ায় পরিবারটি পরে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করায়। সেখানে কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকরিমকে। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত বুধবার সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ, মস্তিষ্কে ইনফেকশন ও পটাশিয়ামের ঘাটতির কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও তার হৃদপিণ্ডে ছিদ্র ছিল বলে জানা গেছে।

তাকরিমের মা জানান, ছেলের হাতে ক্যানোলা লাগানোর কারণে হাত ফুলে গিয়েছিল। প্রতিদিন একাধিক ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছিল। শিশুটির কষ্ট সহ্য করতে পারছিলেন না তিনি। তারপরও আশা ছাড়েননি পরিবারটি।

চিকিৎসা ব্যয় বাড়তে থাকলে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। শিশুটির বাবা একজন অটোরিকশাচালক। তিনি জানান, সন্তানের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাঁরা জানিয়েছিলেন, কেউ যদি চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় তবে সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য তাকেও দিয়ে দিতে রাজি ছিলেন তাঁরা।

এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। হাসপাতালের কয়েক লাখ টাকার বিল পরিশোধেও সহায়তা করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে চলে যায় ছোট্ট তাকরিম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ বাড়ছে। সময়মতো টিকা গ্রহণ ও দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে শিশুদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হামকে সাধারণ অ্যালার্জি বা ভাইরাল জ্বর ভেবে ভুল চিকিৎসা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে জ্বর, র‍্যাশ, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।

হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু নিয়ে এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে। ছোট্ট তাকরিমের মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে কি শিশুটিকে বাঁচানো যেত?শেষ পর্যন্ত বিকেল নাগাদ অ্যাম্বুলেন্সে করে সন্তানের মরদেহ নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা দেন মা-বাবা। তাঁদের কান্না আর অসহায়তা উপস্থিত সবার হৃদয় ভারী করে তোলে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগদান

হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু: তিন হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচল না ৫ মাস বয়সী তাকরিম

Update Time : ০৫:০০:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু নিয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা। তিন হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো গেল না ৫ মাস বয়সী তাকরিমকে। ভুল শনাক্তকরণ, নিউমোনিয়া ও জটিলতায় মৃত্যু হয় শিশুটির।হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু আবারও উদ্বেগ বাড়িয়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ে। ভোলা জেলার ৫ মাস বয়সী শিশু মো. তাকরিমকে বাঁচাতে এক মাস ধরে লড়াই করেছেন তাঁর মা-বাবা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল ঘুরেও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি তাঁরা। হাম, নিউমোনিয়া ও একাধিক জটিলতায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যায় ছোট্ট তাকরিম।

শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালের করিডোরজুড়ে কান্নার পরিবেশ তৈরি হয়। মা আমেনা বেগম বারবার বিলাপ করছিলেন, “আমি তো বাবারে বুকে কইরা আনছি, এখন কেমনে ফালাইয়া যামু।” তাঁর কান্নায় উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ভোলার সদর হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়। জ্বর, কাশি ও শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলেও চিকিৎসকেরা প্রথমে এটিকে অ্যালার্জি হিসেবে শনাক্ত করেন। শিশুটির বাবা মো. মহসীন জানান, তিনি বহুবার চিকিৎসকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন এটি হাম কি না। কিন্তু তাঁকে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা হয়নি।

সময়ের সঙ্গে তাকরিমের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। পরে তাকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি হাম ও হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে পিআইসিইউতে নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ বেড না পাওয়ায় পরিবারটি পরে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করায়। সেখানে কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকরিমকে। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত বুধবার সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয়েছে, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ, মস্তিষ্কে ইনফেকশন ও পটাশিয়ামের ঘাটতির কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও তার হৃদপিণ্ডে ছিদ্র ছিল বলে জানা গেছে।

তাকরিমের মা জানান, ছেলের হাতে ক্যানোলা লাগানোর কারণে হাত ফুলে গিয়েছিল। প্রতিদিন একাধিক ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছিল। শিশুটির কষ্ট সহ্য করতে পারছিলেন না তিনি। তারপরও আশা ছাড়েননি পরিবারটি।

চিকিৎসা ব্যয় বাড়তে থাকলে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। শিশুটির বাবা একজন অটোরিকশাচালক। তিনি জানান, সন্তানের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা পর্যন্ত করতে হয়েছে। এমনকি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাঁরা জানিয়েছিলেন, কেউ যদি চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় তবে সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য তাকেও দিয়ে দিতে রাজি ছিলেন তাঁরা।

এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। হাসপাতালের কয়েক লাখ টাকার বিল পরিশোধেও সহায়তা করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না ফেরার দেশে চলে যায় ছোট্ট তাকরিম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ বাড়ছে। সময়মতো টিকা গ্রহণ ও দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে শিশুদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হামকে সাধারণ অ্যালার্জি বা ভাইরাল জ্বর ভেবে ভুল চিকিৎসা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে জ্বর, র‍্যাশ, কাশি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকেরা।

হামে আক্রান্ত শিশু মৃত্যু নিয়ে এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে। ছোট্ট তাকরিমের মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে কি শিশুটিকে বাঁচানো যেত?শেষ পর্যন্ত বিকেল নাগাদ অ্যাম্বুলেন্সে করে সন্তানের মরদেহ নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা দেন মা-বাবা। তাঁদের কান্না আর অসহায়তা উপস্থিত সবার হৃদয় ভারী করে তোলে।