সিলেটে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ ৯ মাস বয়সী শিশু আবু সাঈদ-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছরে সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ১০০-তে পৌঁছেছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ৮৫ জন হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ২৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রবিবার (১৯ জুলাই) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের কথা জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া শিশু আবু সাঈদ (৯ মাস) সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার দুয়ারাবাজার এলাকার মঈনপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও রবিবার তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বিভাগে হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা তিন অঙ্কে পৌঁছানোয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায়—
- ১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
- ৮৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
- বর্তমানে ২৮৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
- আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা জেলার ভিত্তিতে হলো—
| জেলা | মৃত্যুর সংখ্যা |
|---|---|
| সিলেট | ৩৫ |
| সুনামগঞ্জ | ৪৫ |
| মৌলভীবাজার | ১২ |
| হবিগঞ্জ | ৮ |
| মোট | ১০০ |
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে—
- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪৫ জন
- শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ২৮ জন
- সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৭ জন
- মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২ জন
- রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২ জন
- নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১ জন
এ ছাড়া বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে আগের ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা চলছে।
হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে অন্যের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে রোগটি সাধারণ জ্বর মনে হলেও সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, মস্তিষ্কের জটিলতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- উচ্চমাত্রার জ্বর
- সর্দি ও কাশি
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া
- শরীরে লালচে ফুসকুড়ি
- দুর্বলতা
- খাওয়ার অনীহা
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে পারে—
- সময়মতো টিকা না নেওয়া
- টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশু
- ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ
- অপুষ্টিজনিত দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
- আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা
তবে নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে স্বাস্থ্য বিভাগ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—
- আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি
- সন্দেহভাজন রোগী দ্রুত শনাক্তকরণ
- হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা জোরদার
- প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা
- টিকাদান কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া
- জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—
- জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুদের হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা সময়মতো দিন।
- শিশুর জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে কিছুটা আলাদা রাখুন, যাতে সংক্রমণ কমে।
- শিশুকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
স্বল্প সময়ে মৃতের সংখ্যা ১০০-তে পৌঁছানো সিলেট বিভাগের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ, কার্যকর চিকিৎসা এবং শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব





























