লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরেছেন ১৭৪ বাংলাদেশি নাগরিক। বৃহস্পতিবার (৭ মে) বুরাক এয়ারের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফিরে অনেকেই জানিয়েছেন, ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে দালাল ও মানবপাচারকারীরা তাদের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।
ফেরত আসা বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন। পরে তারা দেশটির বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক হন। তাদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, লিবিয়ায় অবস্থানকালে তারা অপহরণ, নির্যাতন এবং অমানবিক আচরণের শিকার হয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় তাদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তারা। এ সময় তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্যদের সচেতন করতে নিজেদের অভিজ্ঞতা জনসাধারণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়।
ফেরত আসা কয়েকজন জানান, দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা বিপজ্জনক পথে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর অনেককে বন্দি করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কেউ কেউ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবনের আশায় অনেক তরুণ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন অথবা আটক হচ্ছেন।
লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশটির গানফুদা ও তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে বর্তমানে প্রায় ৮৯৫ জন বাংলাদেশির অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম ধাপে ১৭৪ জনকে দেশে ফেরানো হয়েছে।
দূতাবাস আরও জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও দুই ধাপে বাকি বাংলাদেশিদের ফেরত আনার কার্যক্রম চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই ডিটেনশন সেন্টারে আটক থাকা আরও ৫২৪ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে গত ১ এপ্রিল লিবিয়ায় আটক ১৭৫ বাংলাদেশিকেও দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তখন গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার থেকে ১২৩ জন এবং তাজুরা সেন্টার থেকে ৬২ জনকে ফেরত পাঠানো হয়। ধারাবাহিকভাবে দেশে ফেরানোর এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে মানবপাচারকারীদের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নানা প্রলোভন ও ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
লিবিয়া থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের অনেকেই এখন নতুনভাবে জীবন শুরু করার আশা করছেন। কেউ পরিবারের কাছে ফিরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ বিদেশ যাওয়ার ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন