পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের জটিলতা কাটিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে আসছে। সব প্রস্তুতি ঠিক থাকলে শুক্রবার রাশিয়া থেকে বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে করে জ্বালানির চালান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে শনিবার জ্বালানি পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক জটিলতার পর নতুন করে জ্বালানি পরিবহনের এই সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ কার্গো বিমানের মাধ্যমে এই জ্বালানি দেশে আনা হবে। সংবেদনশীল এই ধরনের পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ চলাচলের পুরো রুটে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমতি নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণেই আগের নির্ধারিত ফ্লাইট শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ার পর নতুন সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি আনার আগের নির্ধারিত ফ্লাইটটি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু রুশ কার্গো উড়োজাহাজটির রুটে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় সেটি নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেনি। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামও বিষয়টি নিয়ে জানিয়েছিলেন যে পাকিস্তানের আকাশসীমার অনুমতি না পাওয়ায় জ্বালানি পরিবহনের সূচিতে পরিবর্তন এসেছে।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পরে বিষয়টিকে কারিগরি ও প্রক্রিয়াগত বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। দেশটির হাইকমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক ফ্লাইট ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতির আবেদন নির্ধারিত নিয়ম ও বেসামরিক বিমান চলাচলবিষয়ক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হয়। রুট ও আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে বলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এরপর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম জানায়, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে আবার শুরু হবে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো সরবরাহ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আগের সময়সূচির পরিবর্তে নতুন রুট ও নতুন ফ্লাইট পরিকল্পনা করে জ্বালানি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে করে জ্বালানি শুক্রবার দুপুরের মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবার পরিবহন প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। বিমানবন্দরে জ্বালানি গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর পারমাণবিক জ্বালানি সাধারণ কোনো পণ্যবাহী চালানের মতো পরিবহন করা হবে না। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে এটি রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হবে। পরিবহন থেকে শুরু করে হস্তান্তর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় থাকবে।
শনিবার জ্বালানি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর প্রকল্পের নির্ধারিত কার্যক্রম অনুযায়ী তা সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পরিবহন ও সংরক্ষণের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি কয়েকটি পৃথক চালানে বাংলাদেশে আনা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট সাতটি কার্গো চালানে জ্বালানি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিংয়ের জন্য আরও দুটি চালান আসবে। অর্থাৎ প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিট মিলিয়ে মোট নয়টি চালানে পারমাণবিক জ্বালানি দেশে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। চুক্তি ও প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কয়েকটি ফ্লাইটে জ্বালানি সরবরাহ সম্পন্ন করা হবে।
এর আগে প্রথম ইউনিটের প্রয়োজনীয় জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছেছিল ২০২৩ সালে। এবার দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু হওয়ায় পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এগোচ্ছে।
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। প্রথম ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটের সমপরিমাণ ক্ষমতা যোগ হলে দুই ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিংয়ের কাজ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয়। এটি বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। তবে জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ার পরই বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় না। এর আগে বিভিন্ন পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, সিস্টেম পরীক্ষা এবং কমিশনিংয়ের ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।
প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। ফলে জ্বালানি লোডিংয়ের পরও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো নির্ধারিত নিরাপত্তা ও কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করে ইউনিটটিকে উৎপাদনে নেওয়া।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম প্রকল্পটির নির্মাণ ও পারমাণবিক প্রযুক্তিগত সহায়তার সঙ্গে যুক্ত।
প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় এই কেন্দ্রের উৎপাদন যুক্ত হলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার প্রক্রিয়া সাধারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। জ্বালানি পরিবহন, জ্বালানি লোডিং, যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই, কমিশনিং এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিটি পর্যায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
রসাটমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু করে ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কয়েকটি পৃথক কার্গো ফ্লাইটের মাধ্যমে এই সরবরাহ সম্পন্ন হবে।
এর অর্থ হলো, শুক্রবারের চালানটি পুরো জ্বালানি সরবরাহের একটি অংশ। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আরও চালান বাংলাদেশে আসবে। প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি, পরিবহন নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ স্থানান্তরের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
আগের ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক রুটে একটি অনুমতি বা প্রশাসনিক জটিলতাও পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এবার বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে একটি বড় উৎপাদন প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রটির দুই ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গ্যাস, তরল জ্বালানি, কয়লা ও অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের বৈচিত্র্য বাড়বে। একই সঙ্গে বড় ক্ষমতার একটি বেসলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। তবে কেন্দ্রটির পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় পৌঁছানো কমিশনিং ও নিরাপত্তা পরীক্ষার সফল সমাপ্তির ওপর নির্ভর করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি পরিবহন নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কাটিয়ে নতুন সূচিতে সরবরাহ শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রসাটমও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
সব প্রস্তুতি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে শুক্রবার ঢাকায় পৌঁছাবে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানির নতুন চালান। এরপর শনিবার তা কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হবে। পরবর্তী কয়েক মাসে আরও কয়েকটি চালানের মাধ্যমে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ ও কমিশনিং দুই দিক থেকেই রূপপুর প্রকল্প এখন গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন