মিষ্টি, পায়েস, মিষ্টি চা কিংবা কোমল পানীয় পছন্দ হলেও সবারই চিনি খাওয়ার পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যাদের ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, হৃদ্‌স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন কিংবা দাঁতের ক্ষয় ঠেকাতে চান, তাদের অতিরিক্ত চিনি কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ নিয়মিত বেশি চিনি খেলে অজান্তেই শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে।

চিনি আমাদের দৈনন্দিন খাবারের নানা উপাদানের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। চায়ে বা কফিতে সরাসরি চিনি যোগ করার পাশাপাশি মিষ্টি, কোমল পানীয়, কেক, বিস্কুট, চকলেট, মিষ্টি দই ও বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার থেকেও শরীরে বাড়তি চিনি যেতে পারে। ফলে আলাদা করে মিষ্টি না খেলেও দিনের মোট চিনি গ্রহণ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ফ্রি সুগার গ্রহণ ওজন বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। চিনি থেকে মূলত অতিরিক্ত ক্যালরি পাওয়া যায়। তাই নিয়মিত মিষ্টি খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে।

বিশেষ করে যারা ওজন কমাতে বা বর্তমান ওজন ধরে রাখতে চান, তাদের চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয়ের পরিমাণ কমানো উপকারী হতে পারে। কোমল পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করা এবং চা-কফিতে অতিরিক্ত চিনি না দেওয়ার মতো ছোট অভ্যাসও দৈনিক চিনি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন, তাদের খাবারে চিনি ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সম্পর্কে আরও সচেতন থাকা দরকার। তবে শুধু মিষ্টি বাদ দিলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। মোট খাদ্যাভ্যাস, খাবারের পরিমাণ ও শারীরিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিস থাকলে নিজের সিদ্ধান্তে সব ধরনের কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করা ভালো। একই সঙ্গে মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবার সীমিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের কথা ভাবছেন এমন ব্যক্তিদের জন্যও বাড়তি চিনি কম খাওয়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ গ্রাম এবং পুরুষদের প্রায় ৩৬ গ্রাম অ্যাডেড সুগারের মধ্যে থাকা উচিত।

এই পরিমাণ শুধু চা বা কফিতে দেওয়া চিনির হিসাব নয়। কোমল পানীয়, মিষ্টি দই, কেক, বিস্কুট, চকলেটসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তি চিনি থাকতে পারে। তাই খাবারের মোড়কে থাকা পুষ্টি তথ্য দেখে চিনি বা অ্যাডেড সুগারের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া ভালো।

চিনি কম খাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দাঁতের স্বাস্থ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খাবার ও পানীয়ের ফ্রি সুগার দাঁতের ক্ষয়ের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। বিশেষ করে বারবার চিনিযুক্ত খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে দাঁতের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

ডব্লিউএইচও ফ্রি সুগার মোট দৈনিক ক্যালরির ১০ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দেয়। আরও স্বাস্থ্যগত সুবিধার জন্য এটি ৫ শতাংশের নিচে রাখার কথা বলা হয়েছে। ২ হাজার ক্যালরির খাদ্যতালিকার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ প্রায় ৫০ গ্রাম বা ১২ চা-চামচ চিনির সমান।

শিশুদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত মিষ্টি, চকলেট, চিনিযুক্ত পানীয় কিংবা চিনি দেওয়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমানো উচিত। এতে তাদের দাঁতের স্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।

তবে ফ্রি সুগার আর গোটা ফলের স্বাভাবিক চিনি এক বিষয় নয়। গোটা ফলে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি ফ্রি সুগারের হিসাবের মধ্যে পড়ে না। তাই চিনি কমানোর অর্থ ফল খাওয়া বন্ধ করা নয়, বরং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবার ও পানীয়ের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাই মূল লক্ষ্য।

মিষ্টি খেতে পছন্দ করলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখলে দৈনিক চিনি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষ করে কোমল পানীয়, মিষ্টি খাবার ও অতিরিক্ত চিনি দেওয়া প্যাকেটজাত খাবার কমিয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।