পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার লক্ষণ অনেক পুরুষই প্রথমে বুঝতে পারেন না। ভাবেন, বয়স হচ্ছে, তাই শরীর একটু ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে এই হরমোনের মাত্রা সত্যিই কমতে পারে, আর তার প্রভাব পড়ে শরীর ও মন দুটোতেই।
টেস্টোস্টেরন মূলত অণ্ডকোষে তৈরি হয়। যৌন আকাঙ্ক্ষা, পেশির বিকাশ, হাড়ের ঘনত্ব, শরীরের গঠন ও শুক্রাণু তৈরিতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর মাত্রা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমে ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের ৯টি লক্ষণ নজরে এলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১. যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া
টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া। আগে যে বিষয়ে স্বাভাবিক আগ্রহ ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি কমে যেতে পারে। যৌন আকাঙ্ক্ষার এই পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন।
২. উত্থান ধরে রাখতে সমস্যা
কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে যৌন উত্তেজনার সময় লিঙ্গের উত্থান তৈরি বা ধরে রাখায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এমন সমস্যা শুধু হরমোনের ঘাটতির কারণে হয় না। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ, রক্তনালির সমস্যা এবং কিছু ওষুধও এর কারণ হতে পারে।
৩. হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া
টেস্টোস্টেরনের সঙ্গে হাড়ের ঘনত্বেরও সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় এই হরমোনের মাত্রা কম থাকলে হাড়ের শক্তি কমে যেতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে এতে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
৪. শরীরের লোমের বৃদ্ধি কমে যাওয়া
টেস্টোস্টেরন পুরুষের শরীরের লোমের বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে। তাই এর মাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে দাড়ি, বুক, হাত-পা বা শরীরের অন্যান্য অংশের লোম আগের তুলনায় কম ঘন হতে পারে। তবে বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তনেও চুল ও লোমের ঘনত্ব কমতে পারে।
৫. মেজাজে পরিবর্তন আসা
হরমোনের পরিবর্তন শুধু শরীরেই নয়, মনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। টেস্টোস্টেরন কমে গেলে কিছু পুরুষের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগে ঘাটতি, আগ্রহ কমে যাওয়া বা মন খারাপ থাকার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এসব সমস্যার পেছনে মানসিক চাপ বা অন্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
৬. ঘুমের সমস্যা হওয়া
রাতে ভালোভাবে ঘুম না হওয়া, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও শরীর সতেজ না লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি এবং ঘুমের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলেও শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে।
৭. পেশির শক্তি কমে যাওয়া
আগের তুলনায় শরীরের শক্তি কমে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক কাজ করতেই বেশি পরিশ্রম মনে হওয়া টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য লক্ষণ। এই হরমোন পেশির গঠন ও ভর ধরে রাখতে সাহায্য করে। মাত্রা কমে গেলে পেশির ভর কমার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
৮. ওজন বেড়ে যাওয়া
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে পেটের আশপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমার বিষয়টি লক্ষ্য করা যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গেও কম টেস্টোস্টেরনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
৯. সবসময় ক্লান্তি অনুভব করা
পর্যাপ্ত ঘুম বা বিশ্রামের পরও যদি সারাক্ষণ শরীর ভারী লাগে, কাজ করার আগ্রহ কমে যায় কিংবা সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে কিছু পুরুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে রক্তস্বল্পতা, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপসহ আরও অনেক কারণেও এমন হতে পারে।
টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে শরীরে হরমোনের ঘাটতি রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ একই ধরনের উপসর্গ অন্য অনেক শারীরিক সমস্যাতেও দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে একাধিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা যাচাই করা হয়।
শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিজে থেকে টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন, জেল বা কোনো হরমোনের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। উপসর্গ থাকলে ইউরোলজিস্ট বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।


মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন