আর্থিক চাপ সামাল দিতে নতুন অর্থায়নের পথ খুঁজছে সরকার। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ব্যয়সংকোচন বা কৃচ্ছসাধনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে যানবাহন কেনা, নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণসহ বেশ কয়েকটি খাতে ব্যয় সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফর, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ এবং সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম সুবিধাও স্থগিত রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এবং বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন অর্থের উৎস খুঁজছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)সহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের উদ্যোগে এখন ‘সার্বভৌম বন্ড’ বা Sovereign Bond ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিকল্প অর্থায়নের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যুর বিষয়টি। পাশাপাশি প্রথম আন্তর্জাতিক বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারে বন্ড ছাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বার্ষিক ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশলে ইউরো বন্ড বা অন্যান্য সার্বভৌম বন্ড অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারে প্রবেশের আগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, আন্তর্জাতিক বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শর্ত, সুদের হার, মুদ্রা ঝুঁকি, পরিশোধ কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিতে হবে। এসব দিক বিশ্লেষণ ও যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন অর্থায়ন কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কিছু উদ্বেগ থাকতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এখনো রেয়াতি ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশ হওয়ায় বাণিজ্যিক ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়লে ভবিষ্যতের ঋণ ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর আগে দেশের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং উন্নত করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকি মূল্যায়ন, মুদ্রার ধরন, বন্ডের পরিমাণ, সুদের হার এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার কাঠামো নির্ধারণে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বিষয়টি সার্বিকভাবে পর্যালোচনার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান আকার প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ডলার এবং আগামী কয়েক বছরে তা আরও বাড়বে। তাঁর মতে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা জরুরি। এসব সূচকে উন্নতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ড ইস্যু করা সহজ হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।
বিশ্বের অনেক দেশ অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, পরিবহন ও বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য আন্তর্জাতিক বন্ড বাজার ব্যবহার করে থাকে। সফলভাবে বন্ড ইস্যু করতে পারলে বাংলাদেশও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। তবে এর সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের চাপ, মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
উল্লেখ্য, সার্বভৌম ঋণ হলো এমন ঋণ, যা একটি রাষ্ট্র নিজ নামে আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করে। সাধারণত সরকারি ট্রেজারি বিল, বন্ড বা অন্যান্য ঋণপত্রের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এসব বন্ডের ক্রেতা হতে পারেন ব্যক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বিদেশি সরকার কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আর পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে বিদেশি সরকার বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যুকৃত বন্ড, যা সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


























