আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মিশন এখন ঢাকায় অবস্থান করছে। সপ্তাহজুড়ে চলা এই সফরে আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সূচক, সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা এবং সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশলগুলো এই আলোচনার মূল এজেন্ডা হিসেবে স্থান পাচ্ছে।
সরকার মূলত এই আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আগামী তিন বছরের জন্য প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বড় আর্থিক প্যাকেজ পাওয়ার আশা করছে। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন করা, ডলার সংকটের চাপ সামাল দেওয়া এবং থমকে যাওয়া অর্থনৈতিক সংস্কারের গতিকে পুনরুদ্ধার করা। এই উদ্দেশ্যে গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইএমএফের সদর দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে রাজনৈতিক অর্থনীতির পটপরিবর্তন ও বৈশ্বিক তীব্র অনিশ্চয়তার কারণে আগের কিছু সংস্কার যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবারের আইএমএফের নতুন ঋণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দেশের আর্থিক ও ব্যাংক খাতের কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন। সদ্য ঘোষিত বাজেটে বিভিন্ন খাতে দেওয়া করছাড়ের যৌক্তিকতা এবং আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে সংস্থাটি কড়া মূল্যায়ন করবে। বিশেষ করে দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করা, দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন বা অবসায়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের টেকসই ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে এগোচ্ছে, তা আইএমএফ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখবে।
এবারের সফরে আইএমএফ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামো এবং এর আর্থিক প্রভাব নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি মূল্যায়ন পরিচালনা করবে। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীর মোট সংখ্যা, নতুন নিয়োগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিদ্যমান বেতনকাঠামোর অসঙ্গতি এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির নীতিমালার কারণে বাজেটে কী ধরনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, সেই সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান জানতে চাইবে সংস্থাটি। সরকারের রাজস্ব আদায় আশঙ্কাজনকভাবে কম হওয়া এবং একই সাথে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার মূল কারণগুলোও এই টেবিলে খতিয়ে দেখা হবে।
অর্থনীতির অন্যতম সংবেদনশীল খাত হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক আর্থিক সংকট নিয়ে পৃথক ও নিবিড় পর্যালোচনা করবে আইএমএফের নতুন ঋণ মিশন। দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির বিশাল ব্যয় এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের কৌশল নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। এর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বা এডিপির অর্থ বরাদ্দের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলবে আইএমএফ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, সে বিষয়েও সংস্থাটি তাদের নিজস্ব মডেলে মূল্যায়ন করবে।
বাংলাদেশ এর আগে ২০২৩ সালে আইএমএফের সাথে ৪৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুরোধে বাড়িয়ে ৫৫৫ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেলেও ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে দীর্ঘ এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা আটকে যায়, যার ফলে উভয় পক্ষই এখন এই সম্পূর্ণ নতুন কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে। ঢাকা সফর শেষে এই প্রতিনিধিদলটি ওয়াশিংটনে তাদের সদর দপ্তরে একটি বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। যদি এই প্রাথমিক মূল্যায়ন ইতিবাচক হয়, তবে আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে আরেকটি আনুষ্ঠানিক মিশন ঢাকায় আসবে।




























