ঢাকা ০২:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রবেশপথ, কেন আলোচনার কেন্দ্রে এই করিডর?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০১:০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ৫০২

মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে বাড়ছে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব। ছবি: সংগৃহীত

চীনের বহুদিনের কৌশলগত লক্ষ্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশের পথ তৈরি করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখন চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি)। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই করিডর শুধু বাণিজ্য নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশকে এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব আসায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে অবস্থিত কিয়াউকফিউ বন্দর বাইরে থেকে সাধারণ একটি সমুদ্রবন্দর মনে হলেও চীনের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বন্দর ব্যবহার করে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে। এতে মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর মূলত চীনের বৃহৎ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাজুড়ে সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।

সিএমইসি শুরু হয়েছে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে। এরপর এটি সীমান্ত শহর মুসে হয়ে মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ শহর মান্দালয়ে প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে একটি অংশ ইয়াঙ্গুনের দিকে গেলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে।

এই করিডরে রয়েছে আধুনিক মহাসড়ক, উচ্চগতির রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইন। পুরো অবকাঠামো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সরাসরি ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে।

ইতোমধ্যে কিয়াউকফিউ থেকে ইউনান পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের দুটি পাইপলাইন চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা জ্বালানি সহজেই চীনের অভ্যন্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রপথে দীর্ঘ ভ্রমণের প্রয়োজন কমেছে।

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিষয় হলো তথাকথিত ‘মালাক্কা সংকট’। বর্তমানে দেশটির অধিকাংশ জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করে। আন্তর্জাতিক সংঘাত দেখা দিলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীন মনে করে, কোনো সামরিক উত্তেজনা বা ভূরাজনৈতিক সংকটে মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ হলে তাদের জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। তাই বিকল্প নিরাপদ পথ তৈরি করাই বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

সিএমইসি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তেলবাহী জাহাজ সরাসরি কিয়াউকফিউ বন্দরে ভিড়তে পারবে। এরপর পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই জ্বালানি ইউনান প্রদেশে পৌঁছে যাবে। এতে সময়, পরিবহন ব্যয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি—সবই কমবে।

শুধু জ্বালানি নয়, এই করিডর চীনের তুলনামূলক অনুন্নত ইউনানসহ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব অঞ্চলের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের জন্যও এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে শত শত কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগ দেশটির জন্য বড় অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন শিল্পপার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকার রাজস্ব আয়ও বাড়াতে পারবে বলে আশা করছে।

তবে এই করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। রাখাইনসহ করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে জান্তা বাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ করে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া অনেক এলাকা করিডরের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে নির্মাণকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও উদ্বেগে রয়েছেন।

এ ছাড়া মিয়ানমারের নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ, চীনের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প দেশটিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগণের বাস্তুচ্যুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

সম্প্রতি এই করিডরকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে। চীন চায় মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যন্ত করিডর সম্প্রসারণ করে একটি ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে কিয়াউকফিউ এবং ইউনান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হতে পারে। এতে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে বহুমুখী যোগাযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের জন্য এতে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা। ইউনান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার তৈরি হলে রপ্তানি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ট্রানজিট ও লজিস্টিকস খাতেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে ঝুঁকিও কম নয়। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

এ কারণে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রস্তাবটি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

এদিকে এই করিডরকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। ভারত কিয়াউকফিউ বন্দরে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

ভারতের মতে, এটি চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বাড়ছে। এর জবাবে ভারত কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পসহ নিজস্ব অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কোয়াড জোটও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় পশ্চিমা দেশগুলোও এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।

বর্তমানে কুনমিং থেকে কিয়াউকফিউ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল ও বাণিজ্যপথের অনেক অংশ নিরাপত্তাজনিত কারণে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় আকারের নিরাপদ বাণিজ্য পরিচালনা এখনো সম্ভব হয়নি।

চীন একাধিকবার যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে করিডরের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

তবু বেইজিং এ প্রকল্প থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। কারণ চীনের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভারত মহাসাগরে কৌশলগত উপস্থিতির সঙ্গে এই করিডর সরাসরি জড়িত।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এটি সম্ভাবনা ও ঝুঁকির সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুপুরে ভাতঘুমে কি সত্যিই বাড়ে ব্লাড সুগার? কতক্ষণ ঘুম নিরাপদ, জানালেন বিশেষজ্ঞ

বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রবেশপথ, কেন আলোচনার কেন্দ্রে এই করিডর?

Update Time : ০১:০৪:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

চীনের বহুদিনের কৌশলগত লক্ষ্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশের পথ তৈরি করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখন চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি)। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই করিডর শুধু বাণিজ্য নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশকে এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব আসায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে অবস্থিত কিয়াউকফিউ বন্দর বাইরে থেকে সাধারণ একটি সমুদ্রবন্দর মনে হলেও চীনের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বন্দর ব্যবহার করে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে। এতে মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।

চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর মূলত চীনের বৃহৎ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাজুড়ে সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।

সিএমইসি শুরু হয়েছে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে। এরপর এটি সীমান্ত শহর মুসে হয়ে মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ শহর মান্দালয়ে প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে একটি অংশ ইয়াঙ্গুনের দিকে গেলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে।

এই করিডরে রয়েছে আধুনিক মহাসড়ক, উচ্চগতির রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইন। পুরো অবকাঠামো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সরাসরি ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে।

ইতোমধ্যে কিয়াউকফিউ থেকে ইউনান পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের দুটি পাইপলাইন চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা জ্বালানি সহজেই চীনের অভ্যন্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্রপথে দীর্ঘ ভ্রমণের প্রয়োজন কমেছে।

আরও পড়ুন  প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মার্কিন রাষ্ট্রদূত সাক্ষাৎ: সামরিক সহযোগিতা জোরদারে আলোচনা

চীনের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিষয় হলো তথাকথিত ‘মালাক্কা সংকট’। বর্তমানে দেশটির অধিকাংশ জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করে। আন্তর্জাতিক সংঘাত দেখা দিলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীন মনে করে, কোনো সামরিক উত্তেজনা বা ভূরাজনৈতিক সংকটে মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ হলে তাদের জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। তাই বিকল্প নিরাপদ পথ তৈরি করাই বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

সিএমইসি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা তেলবাহী জাহাজ সরাসরি কিয়াউকফিউ বন্দরে ভিড়তে পারবে। এরপর পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই জ্বালানি ইউনান প্রদেশে পৌঁছে যাবে। এতে সময়, পরিবহন ব্যয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি—সবই কমবে।

শুধু জ্বালানি নয়, এই করিডর চীনের তুলনামূলক অনুন্নত ইউনানসহ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব অঞ্চলের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের জন্যও এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে শত শত কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগ দেশটির জন্য বড় অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন শিল্পপার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকার রাজস্ব আয়ও বাড়াতে পারবে বলে আশা করছে।

আরও পড়ুন  ইবোলা ভাইরাসে সৌদি আরবের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: তিন আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের ওপর নতুন সিদ্ধান্ত

তবে এই করিডরের সবচেয়ে বড় বাধা মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। রাখাইনসহ করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে জান্তা বাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ করে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া অনেক এলাকা করিডরের নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে নির্মাণকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও উদ্বেগে রয়েছেন।

এ ছাড়া মিয়ানমারের নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ, চীনের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প দেশটিকে ‘ঋণের ফাঁদে’ ফেলতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগণের বাস্তুচ্যুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

সম্প্রতি এই করিডরকে ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে। চীন চায় মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যন্ত করিডর সম্প্রসারণ করে একটি ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে কিয়াউকফিউ এবং ইউনান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হতে পারে। এতে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে বহুমুখী যোগাযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের জন্য এতে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা। ইউনান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার তৈরি হলে রপ্তানি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ট্রানজিট ও লজিস্টিকস খাতেও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে ঝুঁকিও কম নয়। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

এ কারণে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রস্তাবটি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন  যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ যেসব দেশের জন্য ভিসা স্থগিত করল

এদিকে এই করিডরকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। ভারত কিয়াউকফিউ বন্দরে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

ভারতের মতে, এটি চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব বাড়ছে। এর জবাবে ভারত কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পসহ নিজস্ব অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কোয়াড জোটও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় পশ্চিমা দেশগুলোও এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।

বর্তমানে কুনমিং থেকে কিয়াউকফিউ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল ও বাণিজ্যপথের অনেক অংশ নিরাপত্তাজনিত কারণে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় আকারের নিরাপদ বাণিজ্য পরিচালনা এখনো সম্ভব হয়নি।

চীন একাধিকবার যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে করিডরের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

তবু বেইজিং এ প্রকল্প থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। কারণ চীনের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভারত মহাসাগরে কৌশলগত উপস্থিতির সঙ্গে এই করিডর সরাসরি জড়িত।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এটি সম্ভাবনা ও ঝুঁকির সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব ভবিষ্যতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হতে পারে।