ঢাকা ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংকের ৪০% আমানত কোটিপতিদের দখলে

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১০:২৫:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৫

ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই কোটিপতিদের হিসাবে। ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংকের কোটিপতি হিসাব দেশে আবারও আলোচনায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে জমা থাকা মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই রয়েছে কোটিপতিদের হিসাবে। অর্থাৎ ব্যাংকে থাকা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৪০ টাকাই জমা আছে কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবগুলোতে। যদিও মোট ব্যাংক হিসাবের তুলনায় কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা রয়েছে ১ কোটি টাকা বা তার বেশি জমা থাকা হিসাবগুলোতে। অন্যদিকে, ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা রয়েছে এমন হিসাবগুলোতে রয়েছে মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। বিপরীতে, ১ লাখ টাকার কম জমা থাকা কোটি কোটি হিসাব মিলিয়ে রয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ আমানত।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা ১৮ কোটি ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি হিসাবে। অথচ ১ লাখ টাকার কম জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের হিসাব সংখ্যায় বেশি হলেও, আমানতের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে অল্পসংখ্যক বড় হিসাবধারীর কাছে।

গত তিন মাসেও কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা এবং জমা—দুই-ই বেড়েছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৪৪১টি। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা হয়েছে অতিরিক্ত প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। মোট নতুন আমানতের প্রায় অর্ধেকই যুক্ত হয়েছে এই শ্রেণির হিসাবগুলোতে, যা ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের আমানতের প্রবণতা আরও স্পষ্ট করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৭৪টি। এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি হিসাবে গড়ে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এসব হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান দেখে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের বৈষম্য মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের মধ্যে সরকারি সংস্থা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে বড় অঙ্কের আমানত প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবেও জমা থাকা স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও তুলে ধরে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং সঞ্চয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেশি হলেও, বড় অঙ্কের আমানত সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় ব্যাংক খাতের তারল্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতের ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যাংকের ৪০% আমানত কোটিপতিদের দখলে

Update Time : ১০:২৫:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

ব্যাংকের কোটিপতি হিসাব দেশে আবারও আলোচনায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে জমা থাকা মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশই রয়েছে কোটিপতিদের হিসাবে। অর্থাৎ ব্যাংকে থাকা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৪০ টাকাই জমা আছে কোটি টাকার বেশি অর্থ থাকা হিসাবগুলোতে। যদিও মোট ব্যাংক হিসাবের তুলনায় কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা রয়েছে ১ কোটি টাকা বা তার বেশি জমা থাকা হিসাবগুলোতে। অন্যদিকে, ১ লাখ থেকে ৯৯ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা রয়েছে এমন হিসাবগুলোতে রয়েছে মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। বিপরীতে, ১ লাখ টাকার কম জমা থাকা কোটি কোটি হিসাব মিলিয়ে রয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ আমানত।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা ১৮ কোটি ২৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি হিসাবে। অথচ ১ লাখ টাকার কম জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের হিসাব সংখ্যায় বেশি হলেও, আমানতের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে অল্পসংখ্যক বড় হিসাবধারীর কাছে।

গত তিন মাসেও কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা এবং জমা—দুই-ই বেড়েছে। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ২ হাজার ৪৪১টি। একই সময়ে এসব হিসাবে জমা হয়েছে অতিরিক্ত প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। মোট নতুন আমানতের প্রায় অর্ধেকই যুক্ত হয়েছে এই শ্রেণির হিসাবগুলোতে, যা ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের আমানতের প্রবণতা আরও স্পষ্ট করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৭৪টি। এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি হিসাবে গড়ে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এসব হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান দেখে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের বৈষম্য মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের মধ্যে সরকারি সংস্থা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবও অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে বড় অঙ্কের আমানত প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবেও জমা থাকা স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে সম্পদের কেন্দ্রীভবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও তুলে ধরে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং সঞ্চয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বেশি হলেও, বড় অঙ্কের আমানত সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় ব্যাংক খাতের তারল্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতের ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আস্থা বাড়ানো এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।