চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘি ময়দান শনিবার (২৫ এপ্রিল) সাক্ষী হলো আরও একটি জমজমাট লড়াইয়ের। শতবর্ষী আবদুল জব্বারের বলীখেলার ১১৭তম আসরে টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন কুমিল্লার বাঘা শরীফ। অন্যদিকে, গতবারের মতো এবারও রানারআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো রাশেদ বলীকে।
শনিবার দুপুর ৩টার দিকে হাজারো দর্শকের তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এই মেলা ও প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।

তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ১০৮ জন বলী অংশ নেন। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, ফেনী, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ির পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকেও ছুটে এসেছেন প্রতিযোগীরা। বিশেষ করে তরুণ বলীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আয়োজকরা মনে করছেন, এই তরুণদের হাত ধরেই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি ভবিষ্যতে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে।
মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই প্রথম রাউন্ড থেকেই প্রতিটি ধাপে ছিল চরম উত্তেজনা। বাছাই পর্বে বিজয়ী ৫০ জন বলীকে সনদ ও বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে সেরা বলীদের মধ্য থেকে চূড়ান্ত চারজন সেমিফাইনাল ও ফাইনালে অংশ নেন।
শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে মুখোমুখি হন কুমিল্লার রাশেদ বলী এবং সাবেক দুইবারের চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ। দুই বলীর মধ্যে দীর্ঘক্ষণ চলা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শেষ হাসি হাসেন বাঘা শরীফ। এর মধ্য দিয়ে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়লেন তিনি।
খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চসিক সচিব আশরাফুল আমিন।
কড়া নিরাপত্তা ও উৎসবমুখর পরিবেশ লালদীঘি ময়দান এদিন কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। মাঠের চারপাশ, আশপাশের ভবনের ছাদ এমনকি সীমানা প্রাচীর টপকেও অসংখ্য মানুষ খেলা উপভোগ করেছেন।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলমান এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে মেলা ও খেলার সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যাতে পরীক্ষার্থীদের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
নিরাপত্তার স্বার্থে মাঠজুড়ে ছিল কড়া নজরদারি। সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন এবং ওয়াচ টাওয়ার বসানোর পাশাপাশি সিএমপি ও র্যাবের সমন্বয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মেডিকেল টিম ও ফায়ার সার্ভিসও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
ইতিহাসের পাতা থেকে ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের তরুণ সমাজকে শারীরিকভাবে চাঙ্গা এবং ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলীখেলার প্রচলন করেন। সময়ের পরিক্রমায় শতাধিক বছর পেরিয়ে এটি আজ শুধু একটি খেলা নয়, চট্টগ্রামের মানুষের প্রাণের লোকজ ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।


























