প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে জাতীয় সংসদে। দেশের ২ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই উদ্যোগকে শিক্ষা খাতে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন। এতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে।
অধিবেশনের ১১তম দিনের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সংসদে শিক্ষাখাতের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষাকে জাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে। একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। ধাপে ধাপে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে মোট ৪৩টি ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনার মাধ্যমে শিক্ষার মান বাড়ানো, সুযোগ বৃদ্ধি এবং বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে। এটি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে শুরু করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচি দেশের সব উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। এর ফলে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতেও এটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতেও সরকার নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ধাপে ধাপে সব উপজেলায় স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এজন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিকসহ সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে।
ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সরকার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রায় ১,৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা সহজেই অনলাইন শিক্ষার সুযোগ পাবে। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য ‘এডু-আইডি’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তথ্যভিত্তিক করা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও সহজ হবে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন করা হবে। একইসঙ্গে সব জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি সহজ হবে।
কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে ২,৩৩৬টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু করা হবে। এটি শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকেও যুগোপযোগী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৮,২৩২টি মাদ্রাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও ডিজিটাল শিক্ষার আওতায় আসবে। মাদ্রাসাগুলোতে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে মাদ্রাসা শিক্ষা আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী হবে।
সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা খাতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও মিড-ডে মিল চালুর মতো উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে। সব মিলিয়ে, প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার উন্নয়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।





























