জাতীয় সংসদে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে যে, বিটিভির আয়ের চেয়ে ব্যয় ৩২ গুণ বেশি। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে বিটিভির মোট আয় হয়েছে ৮ কোটি ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় হয়েছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। সোমবার জাতীয় সংসদে নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এই তথ্য উপস্থাপন করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য সংসদের টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
তথ্যমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে বিটিভির আয়ের বড় অংশ এসেছে বিজ্ঞাপন খাত থেকে। বিজ্ঞাপন শাখার রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ ৯ হাজার ৪১৭ টাকা। তবে এই আয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম হওয়ায় অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক অর্থবছর ধরেই বিটিভির আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান বিদ্যমান। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল ৩৪ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ২৮০ কোটি ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু ব্যয় ছিল ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ফলে আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ওই বছরে বিটিভির আয় ছিল ৩০ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় দাঁড়ায় ৩৭০ কোটি ৬১ লাখ ৫১ হাজার টাকা, যা আলোচ্য সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয়ের অন্যতম উদাহরণ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিটিভির আয় বেড়ে ৪৪ কোটি ২১ লাখ ২২ হাজার টাকায় পৌঁছালেও ব্যয় ছিল ২৯৮ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যেখানে ব্যয় হয় ৩০৭ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা।
সংসদে একই দিনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরা হয়। জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী জানান, অপপ্রচার, কুৎসা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় ‘বাংলাফ্যাক্ট’ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাফ্যাক্ট ৭৮৩টি তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানভিত্তিক প্রতিবেদন এবং ভিডিও বা রিল প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকাশিত হয়েছে ২২৯টি প্রতিবেদন।
তথ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের আদলে পরিচালিত ১৬টি অপতথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করে এমন ৩০০টির বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এবং ১৯৯টি এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গণমাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন এবং চরিত্রহননের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ ‘শিকারী সাংবাদিকতা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে। বিষয়টি গণমাধ্যম জগতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে তথ্য অধিদপ্তরের তথ্য যাচাই কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র, অনলাইন মাধ্যম, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এদিকে সাংবাদিকদের পেশাগত মান উন্নয়ন এবং ভুয়া পরিচয়ে সাংবাদিকতা রোধে নতুন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
জামালপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, নিবন্ধন এবং তথ্যভান্ডার তৈরির লক্ষ্যে প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪ সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত সাংবাদিকদের তথ্য হালনাগাদ করে একটি অনলাইন তথ্যভান্ডার তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। এতে পেশাদার সাংবাদিকদের পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে ৫৫টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি চ্যানেল নিয়মিত সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও জানান, সারা দেশে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা এক হাজার ৪৩৬টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় ৫৯৩টি এবং অন্যান্য জেলা থেকে প্রকাশিত হয় ৮৪৩টি পত্রিকা। নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা ৪৭৪টি। চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গত ১৫ বছরে ৪০টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে ৬টি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিটিভির আয়ের চেয়ে ব্যয় ৩২ গুণ বেশি হওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও আয় বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম খাতের বিভিন্ন নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।



























