মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদার ব্যক্তিদের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) এবং উপমন্ত্রী ও সমমর্যাদার ব্যক্তিদের একান্ত সচিবদের (পিএস) মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি চাকরির বাইরে থেকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তার মূল বেতন এখন থেকে হবে ৩২ হাজার ৫৪০ টাকা।
সম্প্রতি অর্থ বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে নবম গ্রেডের প্রাথমিক ধাপে বেতন পাওয়া এপিএস ও পিএসরা এখন উচ্চতর ধাপে বেতন সুবিধা পাবেন।
আগে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী নবম গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত এপিএস ও পিএসদের মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা। বেতন স্কেলের নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী তারা ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত বেতন পাওয়ার সুযোগ পেতেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাদের বেতন আর নবম গ্রেডের প্রাথমিক ধাপে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সরাসরি নবম গ্রেডের অষ্টম ধাপের সমপরিমাণ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৩২ হাজার ৫৪০ টাকা।
অর্থ বিভাগের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি চাকরির বাইরে থেকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া সহকারী একান্ত সচিব ও একান্ত সচিবদের জন্য এই বেতন কাঠামো প্রযোজ্য হবে। এটি একটি বিশেষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে কার্যকর করা হচ্ছে।
সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় এপিএস ও পিএসরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অফিস ব্যবস্থাপনা, সময়সূচি নির্ধারণ, বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় এবং নীতিগত যোগাযোগে তারা সহায়তা করেন।
এ ধরনের পদে দায়িত্ব পালনকারীদের কাজের চাপ ও গুরুত্ব বিবেচনায় দীর্ঘদিন ধরেই বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় পূর্বের মূল বেতন তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
নতুন সিদ্ধান্তে মূল বেতনে প্রায় ১০ হাজার ৫৪০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়া যাচ্ছে। শতকরা হিসাবে এটি প্রায় ৪৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি, যা সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সুবিধা বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট শর্তও যুক্ত করেছে অর্থ বিভাগ। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বেতন কাঠামোর আওতায় নিয়োগপ্রাপ্তরা কোনো ধরনের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট পাবেন না।
অর্থাৎ, জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় নিয়মিত সরকারি কর্মচারীদের মতো প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধি তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। নির্ধারিত মূল বেতনেই তারা দায়িত্ব পালনকালীন সময় পারিশ্রমিক গ্রহণ করবেন।
যদিও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি থাকবে না, তবে বিধি অনুযায়ী অন্যান্য ভাতা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। সরকারি নিয়মে প্রযোজ্য বাসাভাড়া, চিকিৎসা ভাতা কিংবা অন্যান্য অনুমোদিত সুবিধা তারা গ্রহণ করতে পারবেন।
অন্যদিকে, পেনশন সংক্রান্ত সুবিধা এই নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, তারা কোনো ধরনের পেনশন, আনুতোষিক বা ভবিষ্য তহবিলের সুবিধা পাবেন না।
সাধারণত স্থায়ী সরকারি চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তারা অবসর গ্রহণের পর পেনশন এবং আনুতোষিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত এপিএস ও পিএসদের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা বহাল থাকছে না।
প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, এসব পদে নিয়োগ সাধারণত রাজনৈতিক বা বিশেষ আস্থাভিত্তিক বিবেচনায় হয়ে থাকে। তাই তাদের নিয়োগ ও সুবিধার কাঠামোও নিয়মিত সরকারি কর্মচারীদের থেকে কিছুটা আলাদা।
গত ৩১ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত চেয়েছিল। বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব পর্যালোচনা করার পর অর্থ বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি প্রদান করে।
এরপর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে মতামত পাঠানো হয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের পথে আর কোনো বড় বাধা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দায়িত্বের গুরুত্ব এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বেতন পুনর্নির্ধারণ একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ। এতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এসব পদে কাজ করার আগ্রহ বাড়তে পারে।
বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খাতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি প্রায়ই আলোচনায় আসে।
এপিএস ও পিএস পদে দায়িত্ব পালনকারীরা মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীদের দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন। তাদের ওপর নির্ভর করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক যোগাযোগ ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বিশেষ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা, সভা-সমন্বয় এবং নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ পদগুলো প্রশাসনিক কাঠামোর একটি কার্যকর অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই বেতন সুবিধা কেবল সরকারি চাকরির বাইরে থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য প্রযোজ্য। যারা সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় এ ধরনের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম বহাল থাকবে।
এ কারণে নতুন সিদ্ধান্তটি একটি সীমিত পরিসরের বেতন পুনর্নির্ধারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই জাতীয় বেতন স্কেলের সার্বিক পরিবর্তন নয়।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে এপিএস ও পিএসদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে এবং দায়িত্ব পালনে আরও উৎসাহ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজে দক্ষ জনবল আকৃষ্ট করতেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী অস্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এপিএস ও পিএসদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩২ হাজার ৫৪০ টাকায় উন্নীত হওয়ায় তারা উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পেতে যাচ্ছেন, যদিও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও পেনশনের মতো কিছু সুবিধা তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।



























