রাজশাহীতে গাছে বেঁধে মারধরের ঘটনায় চুরির অভিযোগে এক তরুণকে প্রকাশ্যে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। মতিহার থানার পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।রাজশাহীতে গাছে বেঁধে মারধর করার একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। চুরির অভিযোগ তুলে এক তরুণকে গাছের সঙ্গে বেঁধে লাঠি দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর মতিহার থানা এলাকায়। নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার তরুণের নাম মো. তুষার (১৮)। তিনি নগরের কাজলা বিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চুরির সন্দেহে কয়েকজন তরুণ তাঁকে আটক করে প্রকাশ্যে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। পরে সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, তুষারকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। দুই তরুণ হাতে লাঠি নিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করছেন। ভিডিও শুরু হওয়ার আগে একজনকে বলতে শোনা যায়, “চালু করে দিয়েছি।” এরপর ক্যামেরা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মারধর। প্রায় ৪৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে অন্তত ১৪ বার লাঠির আঘাত করা হয় বলে দেখা যায়।
মারধরের সময় তুষারকে ব্যথায় চিৎকার করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি নির্যাতনকারীদের একজনকে উদ্দেশ করে বলেন, “হৃদয়, একটু দাঁড়াও ভাইয়া।” কিন্তু এরপরও থামেননি অভিযুক্তরা। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা উচিত ছিল। নিজেরা বিচারক হয়ে কাউকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করা আইনবিরোধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
এ ঘটনায় মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গোলাম কবির বলেন, আহত তুষারকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, চুরির অভিযোগে তাঁকে মারধর করা হয়েছে। তবে কী চুরির অভিযোগ ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।পুলিশ আরও জানিয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাউকে গাছে বেঁধে মারধর করা যেমন অপরাধ, তেমনি সেই ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াও অপরাধের মধ্যে পড়ে। ভুক্তভোগী বা তাঁর পরিবার অভিযোগ দিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যে অনেক সময় এমন নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করা হয়। এতে অপরাধ প্রবণতা যেমন বাড়ে, তেমনি সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতিও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোর সন্দেহে গণপিটুনি বা প্রকাশ্যে নির্যাতনের ঘটনা বিভিন্ন স্থানে ঘটতে দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এতে নিরপরাধ ব্যক্তিও সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারবহির্ভূত শাস্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালতের মাধ্যমে বিচার হতে হবে। অন্যথায় এমন ঘটনা সমাজে ভয় ও অস্থিরতা বাড়াবে।এদিকে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজশাহীর স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে জানা গেছে। পুলিশ অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিও তদন্তের অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমবে। পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও আইনের প্রতি আস্থা বাড়বে।

























