ঢাকা ১২:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেষ বিদায়েও দুর্ভোগ, গলা সমান পানি পেরিয়ে লাশ কবরস্থানে নিলেন স্বজনরা

গলা সমান পানি পেরিয়ে কবরস্থানে পৌঁছান স্বজনরা। ছবি: সংগৃহীত

ফালডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা মফিজান বেগম বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের সদস্যরা জানাজা শেষে স্বাভাবিক নিয়মেই তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু কবরস্থানে যাওয়ার প্রধান সড়কটি টানা বর্ষণে পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সামনে আসে কঠিন বাস্তবতা।

বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় স্বজনদের সামনে দুটি পথ ছিল—দাফন বিলম্বিত করা অথবা বুক ও গলা সমান পানি পেরিয়ে কবরস্থানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত তারা প্রিয়জনকে যথাসময়ে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেন।

পানির মধ্যেই এগিয়ে চলে জানাজার মিছিল

স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা লাশ কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে পানির মধ্যে দিয়ে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে যান। কোথাও কোমর, কোথাও বুক, আবার কোথাও গলা সমান পানি পেরিয়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছান।

কবরস্থানে পৌঁছানোর পর ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করা হয়। পুরো সময়জুড়ে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভিডিও

ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই মন্তব্য করেন, একটি মরদেহ দাফনের জন্য যদি মানুষকে গলা সমান পানি পেরোতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।

অনেকে দ্রুত ওই সড়ক সংস্কারের দাবি জানান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তি

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফালডাঙ্গী কবরস্থানে যাওয়ার প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কটি বহু বছর ধরে কাঁচা রয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই রাস্তার বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। তখন শুধু জানাজা বা দাফন নয়, স্কুল-কলেজে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্রামবাসীর ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাস

৪ নম্বর ডাঙ্গিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা সড়কটি পাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও সেই আশ্বাস এলাকাবাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো বাস্তবে কোনো উন্নয়নকাজ শুরু হয়নি।

তার মতে, কবরস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াতের জন্য একটি টেকসই সড়ক নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

এলাকাবাসীর দাবি

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু বর্ষাকালে নয়, সারা বছরই এই সড়কটি ব্যবহার করেন শত শত মানুষ। তাই দ্রুত সড়কটি পাকা করা এবং প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তাদের আশা, সাম্প্রতিক এই ঘটনা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামোর দুর্বলতা অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল মুহূর্ত—প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানানোর সময়ও—চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

শেষ বিদায়েও দুর্ভোগ, গলা সমান পানি পেরিয়ে লাশ কবরস্থানে নিলেন স্বজনরা

Update Time : ১১:১৯:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ফালডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা মফিজান বেগম বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের সদস্যরা জানাজা শেষে স্বাভাবিক নিয়মেই তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু কবরস্থানে যাওয়ার প্রধান সড়কটি টানা বর্ষণে পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সামনে আসে কঠিন বাস্তবতা।

বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় স্বজনদের সামনে দুটি পথ ছিল—দাফন বিলম্বিত করা অথবা বুক ও গলা সমান পানি পেরিয়ে কবরস্থানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত তারা প্রিয়জনকে যথাসময়ে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেন।

পানির মধ্যেই এগিয়ে চলে জানাজার মিছিল

স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা লাশ কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে পানির মধ্যে দিয়ে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে যান। কোথাও কোমর, কোথাও বুক, আবার কোথাও গলা সমান পানি পেরিয়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছান।

কবরস্থানে পৌঁছানোর পর ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করা হয়। পুরো সময়জুড়ে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভিডিও

ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকেই মন্তব্য করেন, একটি মরদেহ দাফনের জন্য যদি মানুষকে গলা সমান পানি পেরোতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।

অনেকে দ্রুত ওই সড়ক সংস্কারের দাবি জানান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তি

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফালডাঙ্গী কবরস্থানে যাওয়ার প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কটি বহু বছর ধরে কাঁচা রয়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই রাস্তার বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। তখন শুধু জানাজা বা দাফন নয়, স্কুল-কলেজে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্রামবাসীর ভাষ্য, বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাস

৪ নম্বর ডাঙ্গিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা সড়কটি পাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও সেই আশ্বাস এলাকাবাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো বাস্তবে কোনো উন্নয়নকাজ শুরু হয়নি।

তার মতে, কবরস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াতের জন্য একটি টেকসই সড়ক নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

এলাকাবাসীর দাবি

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু বর্ষাকালে নয়, সারা বছরই এই সড়কটি ব্যবহার করেন শত শত মানুষ। তাই দ্রুত সড়কটি পাকা করা এবং প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তাদের আশা, সাম্প্রতিক এই ঘটনা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামোর দুর্বলতা অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল মুহূর্ত—প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানানোর সময়ও—চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।