হাইপোথাইরয়েডিজম এমন একটি অবস্থা, যেখানে গলার থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে পারে না। এর ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, অবসাদসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস রোগের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে মূলত থাইরক্সিন হরমোন উৎপন্ন হয়। এই হরমোন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় সাহায্য করে। যখন কোনো কারণে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখনই হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দেয়।
কেন হয় হাইপোথাইরয়েডিজম?
হাইপোথাইরয়েডিজমের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো অটোইমিউন রোগ এবং আয়োডিনের ঘাটতি।
প্রধান কারণগুলো হলো—
- থাইরয়েড গ্রন্থির অটোইমিউন রোগ
- খাদ্যে পর্যাপ্ত আয়োডিনের অভাব
- পিটুইটারি গ্রন্থি বা হাইপোথ্যালামাসের সমস্যা
- থাইরয়েড গ্রন্থির আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ
- রেডিয়ো আয়োডিন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- জন্মগত বা জিনগত ত্রুটি
- থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে এনজাইমের সমস্যা
- লিথিয়াম, অ্যামিওডারন ও ইন্টারফেরনের মতো কিছু ওষুধের ব্যবহার
কোন খাবার উপকারী?
চিকিৎসকদের মতে, শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে হাইপোথাইরয়েডিজম পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। তবে সঠিক খাবার রোগের উপসর্গ কমাতে এবং শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
থাইরয়েডের জন্য উপকারী পুষ্টি উপাদান—
- আয়োডিন
- ভিটামিন সি
- ভিটামিন ডি
- ভিটামিন বি১২
- জিংক
- কপার
- সেলেনিয়াম
যেসব খাবার খেতে পারেন—
- পরিমিত পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ
- সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যামন, টুনা ও সারডিন
- দুধ, ডিম ও ইয়োগার্ট
- স্পিরুলিনা ও কড লিভার অয়েল
- আমলকী, লেবু, পেয়ারা, কমলা ও স্ট্রবেরি
- কাঁচা মরিচ
- লাল আটার রুটি, ব্রাউন রাইস ও ওটস
- বাদাম ও অ্যাভোকাডো
- রসুন, পেঁয়াজ ও মাশরুম
- মিষ্টি আলু
কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
কিছু খাবার থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন বা শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এগুলো খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।
পরিমিত খেতে হবে—
- ফুলকপি
- বাঁধাকপি
- ব্রকলি
- শালগম
- ওলকপি
এগুলো ক্রুসিফেরাস গোত্রের সবজি। কাঁচা অবস্থায় বেশি খেলে থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে রান্না করে পরিমিত পরিমাণে খেলে সাধারণত সমস্যা হয় না।
সয়াজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে সতর্কতা—
- সয়াবিন
- সয়া মিল্ক
- সয়া নাগেটস
- টফু
এসব খাবার থাইরয়েড হরমোনের শোষণ কমিয়ে দিতে পারে। তাই থাইরক্সিন খাওয়ার অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পরে এগুলো খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ওজন বৃদ্ধি রোধে প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, ফাস্ট ফুড ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উচিত।
থাইরয়েডের ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় থাইরক্সিন ট্যাবলেট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
ওষুধ সেবনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম—
- সকালে খালি পেটে খেতে হবে।
- নাশতার অন্তত এক ঘণ্টা আগে সেবন করতে হবে।
- প্রতিদিন একই সময়ে খাওয়া ভালো।
- এক গ্লাস পানির সঙ্গে ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হবে।
- আয়রন, ক্যালসিয়াম ও গ্যাসট্রিকের কিছু ওষুধ থাইরক্সিনের চার ঘণ্টার মধ্যে না খাওয়াই ভালো।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডোজ পরিবর্তন বা ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ওষুধ সেবন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে হাইপোথাইরয়েডিজম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়।

























