ঢাকা ১০:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামের টিকা: মা হতে ইচ্ছুক নারীদেরও টিকা নেওয়ার পরামর্শ

  • Asrafi Al Nahin
  • Update Time : ০৮:০২:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫১০

হামের টিকা: মা হতে ইচ্ছুক নারীদেরও টিকা নেওয়ার পরামর্শ

দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা এবার নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। শুধু শিশু নয়, যারা মা হতে ইচ্ছুক—তাদেরও গর্ভধারণের আগে হামের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে নবজাতক ও কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ৩৬ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় অন্তত ৫ হাজার জনের হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এ সময় হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ২২৭ জন, যাদেরও হামে আক্রান্ত বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত দুই দশকে দেশে হামে এত মৃত্যুর নজির নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব শিশু এখনো নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বর্তমানে দেশে শিশুদের জন্য হামের প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু এর আগেই সংক্রমিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ধারণা ছিল মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এখন সেই সুরক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়।

এই বাস্তবতায় গর্ভধারণের আগেই মায়ের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে। ভাইরাস ও টিকাবিশেষজ্ঞদের মতে, মা যদি আগে থেকেই টিকা নিয়ে অ্যান্টিবডি তৈরি করেন, তাহলে তার কিছুটা সুরক্ষা শিশুর শরীরেও পৌঁছাতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলেছেন, গর্ভাবস্থায় হামের টিকা দেওয়া যাবে না। কারণ বর্তমানে ব্যবহৃত এমএমআর বা এমআর টিকা একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন। তাই গর্ভধারণের অন্তত এক থেকে দুই মাস আগে টিকা নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের আরও মত, দেশে টিকাদানে সাম্প্রতিক ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। আগামী ২০ মের মধ্যে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের পাশাপাশি প্রজননক্ষম নারীদের টিকাদানের বিষয়টিও এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, মায়ের টিকা শিশুকে কতদিন সুরক্ষা দিতে পারে—এ নিয়ে স্পষ্ট তথ্য দরকার।

হামের পাশাপাশি রুবেলা নিয়েও সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা। গর্ভাবস্থায় রুবেলা সংক্রমণ হলে শিশুর গুরুতর সমস্যা হতে পারে, যেমন—শ্রবণশক্তি হ্রাস, হৃদরোগ বা চোখের জটিলতা। তাই মা হতে ইচ্ছুক নারীদের রুবেলার টিকা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনো প্রি-কনসেপশন কাউন্সেলিং তেমন প্রচলিত নয়। অথচ সন্তান নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া গেলে মা ও শিশু—দুজনের স্বাস্থ্যই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) এ বিষয়ে সুপারিশ করলে ভবিষ্যতে মা হতে ইচ্ছুক নারীদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের টিকা: মা হতে ইচ্ছুক নারীদেরও টিকা নেওয়ার পরামর্শ

Update Time : ০৮:০২:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা এবার নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। শুধু শিশু নয়, যারা মা হতে ইচ্ছুক—তাদেরও গর্ভধারণের আগে হামের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে নবজাতক ও কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় মাসে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ৩৬ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় অন্তত ৫ হাজার জনের হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। এ সময় হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ২২৭ জন, যাদেরও হামে আক্রান্ত বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত দুই দশকে দেশে হামে এত মৃত্যুর নজির নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব শিশু এখনো নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আরও পড়ুন  সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হচ্ছেন ডা. মাহমুদা মিতু

বর্তমানে দেশে শিশুদের জন্য হামের প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু এর আগেই সংক্রমিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ধারণা ছিল মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এখন সেই সুরক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়।

এই বাস্তবতায় গর্ভধারণের আগেই মায়ের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে। ভাইরাস ও টিকাবিশেষজ্ঞদের মতে, মা যদি আগে থেকেই টিকা নিয়ে অ্যান্টিবডি তৈরি করেন, তাহলে তার কিছুটা সুরক্ষা শিশুর শরীরেও পৌঁছাতে পারে।

আরও পড়ুন  মায়ের দুধের বিকল্প নেই : শিশুর বিকাশে গুরুত্ব জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলেছেন, গর্ভাবস্থায় হামের টিকা দেওয়া যাবে না। কারণ বর্তমানে ব্যবহৃত এমএমআর বা এমআর টিকা একটি লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন। তাই গর্ভধারণের অন্তত এক থেকে দুই মাস আগে টিকা নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের আরও মত, দেশে টিকাদানে সাম্প্রতিক ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। আগামী ২০ মের মধ্যে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের পাশাপাশি প্রজননক্ষম নারীদের টিকাদানের বিষয়টিও এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে, মায়ের টিকা শিশুকে কতদিন সুরক্ষা দিতে পারে—এ নিয়ে স্পষ্ট তথ্য দরকার।

আরও পড়ুন  হামের টিকা কর্মসূচি শুরু: শিশুদের বিনামূল্যে টিকা

হামের পাশাপাশি রুবেলা নিয়েও সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা। গর্ভাবস্থায় রুবেলা সংক্রমণ হলে শিশুর গুরুতর সমস্যা হতে পারে, যেমন—শ্রবণশক্তি হ্রাস, হৃদরোগ বা চোখের জটিলতা। তাই মা হতে ইচ্ছুক নারীদের রুবেলার টিকা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনো প্রি-কনসেপশন কাউন্সেলিং তেমন প্রচলিত নয়। অথচ সন্তান নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া গেলে মা ও শিশু—দুজনের স্বাস্থ্যই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) এ বিষয়ে সুপারিশ করলে ভবিষ্যতে মা হতে ইচ্ছুক নারীদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা হতে পারে।