দেশে আবারও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে হাম। সংক্রামক এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনাও। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ১৮৫ জন রোগী। ফলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি হওয়ায় চিকিৎসকরা সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৭ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৯ হাজার ১২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৯ হাজার ৬৮৬ জন। এই সংখ্যা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হাম সংক্রমণের চিত্র তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে খুব দ্রুত অন্যদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো টিকা গ্রহণ না করা, স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং সচেতনতার অভাব সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৪ হাজার ২৬৩ জন। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেও এখনও অনেক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালগুলোতেও চাপ বাড়ছে। এদিকে একই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬০ হাজার ৬৪ জন রোগী। এটি কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতিকে এখনও উদ্বেগজনক হিসেবেই দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে সংক্রমণ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।
হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টিজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করা গেলে রোগটির বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অনেক অভিভাবক এখনও টিকা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন। ফলে কিছু এলাকায় টিকাদানের হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এই ঘাটতি পূরণে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কারও মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাম ও উপসর্গে মৃত্যু বৃদ্ধির ঘটনা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



























