সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বিভিন্ন খবরে মানুষের সঙ্গে একটি সজারুকে পোষা প্রাণীর মতো থাকতে দেখা যাচ্ছে। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সজারুর স্বাভাবিক আচরণ নয়। সাধারণ অবস্থায় সজারু একটি লাজুক, নিশাচর ও আত্মরক্ষামূলক স্বভাবের বন্যপ্রাণী।
নিচে সজারুর আসল স্বভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো—
সজারু কী ধরনের প্রাণী?
Indian crested porcupine দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশে এটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকাভুক্ত।
সজারুর আসল স্বভাব
১. খুবই লাজুক ও নিরীহ
সজারু সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলে। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অকারণে কোনো প্রাণী বা মানুষের ওপর আক্রমণ করে না।
২. নিশাচর প্রাণী
দিনের বেলায় গর্ত, পাথরের ফাঁক বা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যা ও রাতে খাবারের সন্ধানে বের হয়।
৩. একাকী থাকতে পছন্দ করে
অধিকাংশ সময় একা বা ছোট পারিবারিক দলে বসবাস করে। বড় দলে চলাফেরা খুবই বিরল।
সজারুর সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী?
সজারুর শরীরে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি ধারালো কাঁটা (Quill) থাকতে পারে।
অনেকের ধারণা, সজারু কাঁটা ছুড়ে মারতে পারে। এটি ভুল ধারণা।
আসলে—
- বিপদ টের পেলে কাঁটাগুলো খাড়া করে।
- লেজ ঝাঁকিয়ে সতর্কবার্তা দেয়।
- শত্রু কাছে এলে পেছন ফিরে ধাক্কা দেয়।
- তখন কাঁটা শত্রুর শরীরে ঢুকে যেতে পারে।
অর্থাৎ সজারু কাঁটা নিক্ষেপ করে না।
কী খায়?
সজারু মূলত তৃণভোজী।
খাবারের মধ্যে রয়েছে—
- গাছের শিকড়
- কন্দ
- ফল
- শাক-পাতা
- বাকল
- ভুট্টা
- আলু
- কচু
- বিভিন্ন কৃষিজ ফসল
কখনো কখনো ক্যালসিয়ামের জন্য পড়ে থাকা হাড় চিবাতেও দেখা যায়।
মানুষ কি সজারু পোষ মানাতে পারে?
খুব ছোট বয়স থেকে মানুষের সংস্পর্শে থাকলে কিছু সজারু মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। তবে তাই বলে এটি গৃহপালিত প্রাণী হয়ে যায় না।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে—
- সজারুর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কখনো পুরোপুরি বদলায় না।
- ভয় পেলে হঠাৎ আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।
- বড় হলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশে সজারু পোষা কি বৈধ?
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী ধরে রাখা, কেনাবেচা বা পোষা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
সজারুর পরিবেশগত গুরুত্ব
সজারু বনজ পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা—
- মাটির নিচের কন্দ খুঁড়ে মাটি আলগা করে।
- কিছু উদ্ভিদের বীজ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
- বনজ খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে।
মজার কিছু তথ্য
- সজারুর কাঁটা আসলে পরিবর্তিত লোম।
- জন্মের সময় কাঁটা নরম থাকে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শক্ত হয়ে যায়।
- একটি পূর্ণবয়স্ক সজারুর ওজন ১০–১৮ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
- বনে এদের আয়ু সাধারণত ১০–১৫ বছর, আর নিরাপদ পরিবেশে আরও বেশি বাঁচতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সজারুকে মানুষের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে দেখা গেলেও এটি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নয়। সজারু মূলত বন্য, লাজুক ও নিশাচর প্রাণী। তাই এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলেই নিরাপদে থাকতে দেওয়াই সবচেয়ে উপযুক্ত।


























