বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রখ্যাত লেখক, গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে রাজধানীতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রোববার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে একটি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে গেলে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের অবদান দীর্ঘদিন ধরে সমাদৃত। শিক্ষক, গবেষক এবং প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
তিনি দীর্ঘ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং বিভাগটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে তিনি গবেষণা ও সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রী পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার পক্ষে ছিলেন। রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রসারে তিনি বিভিন্ন সময়ে মতামত দিয়েছেন এবং নানা উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছেন। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে তিনি আজীবন বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।
তিনি ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেছেন। এসব সাময়িকীতে সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর সম্পাদনা ও বিশ্লেষণ পাঠকমহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। নতুন লেখক তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’ এবং ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা’সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যা গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে মূল্যবান তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাহিত্য ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের সাহিত্যাঙ্গনে একজন নির্ভীক চিন্তাবিদ ও গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো এখনো পাঠকদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণাকে জীবনের প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন সাদাসিধে ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। তাঁর মেয়ে ড. শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর জঙ্গি হামলায় দীপন নিহত হন, যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলা একাডেমির গবেষণা কার্যক্রম, প্রকাশনা এবং সাহিত্যচর্চার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা একাডেমির কর্মকাণ্ড নতুন গতি পায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে সাহিত্যিক, শিক্ষক, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, তাঁর প্রজ্ঞা, গবেষণা ও চিন্তার আলো আগামী প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।
বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় তাঁর অবদান কখনো বিস্মৃত হবে না। একজন শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং ভাষাসংগ্রামী চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর মৃত্যু দেশের সাহিত্য ও গবেষণা অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।


























