ঢাকা ০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo বিজিবিএ স্থায়ী কমিটি গঠন, ২০২৬-২৮ মেয়াদে ৬৬ কমিটির ঘোষণা Logo ‘এখানেই শুরু, এখানেই শেষ’—অবসর নিয়ে বড় বার্তা দিলেন নেইমার Logo শিক্ষককে অব্যাহতি ঘিরে উত্তপ্ত দেওভোগ মাদরাসা Logo ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে কোয়ার্টারের আগেই বিদায় ব্রাজিল, এবার আর্জেন্টিনা নয় Logo কসবায় মানবিক উদ্যোগে হুইল চেয়ার পেলেন ২৫ প্রতিবন্ধী Logo সুজানা চৌধুরী: ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাওয়ার্ড জয়ের সর্বশেষ তথ্য Logo আফগানিস্তানের বাসমতী চালের বাজার ধরতে চায় ভারত Logo সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট: সরাসরি সেবা চালুর সর্বশেষ তথ্য Logo জরুরি সতর্কতা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে সাবধান Logo মেট্রোরেল কমলাপুর: ২০২৭ সালের এপ্রিলে চালুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে কোয়ার্টারের আগেই বিদায় ব্রাজিল, এবার আর্জেন্টিনা নয়

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের হতাশায় ব্রাজিলের ফুটবলাররা। ছবি: সংগৃহীত।

বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলটির নামের পাশে রয়েছে পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপা। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে রয়েছে। ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলো থেকে বিদায় ছিল তেমনই একটি ঘটনা। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো—তবে এবার প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা নয়, ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শেষ ষোলো ম্যাচে নিউ জার্সির মাঠে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। এর মাধ্যমে হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সেলেসাওদের।

৩৬ বছর পর ফিরল সেই তিক্ত স্মৃতি

ব্রাজিল সর্বশেষ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে বিদায় নিয়েছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। সেবার শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল তারা।

সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি Diego Maradona মাঝমাঠ থেকে অসাধারণ এক ড্রিবল করে বল বাড়িয়ে দেন Claudio Caniggia-কে। ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলেই বিদায় নেয় ব্রাজিল।

এরপর ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২—প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত কোয়ার্টার-ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল ব্রাজিল। কিন্তু এবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেল।

নরওয়ের কাছে হার, ইতিহাসের নতুন অধ্যায়

বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল নরওয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই তারা সাহসী ফুটবল খেলেছে।

নরওয়ের আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন এরলিং হালান্ড (Erling Haaland)। তার নেতৃত্বে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক বারবার চাপে ফেলে ব্রাজিলের রক্ষণকে।

ব্রাজিল বলের দখল বেশি রাখলেও সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে নরওয়ে সীমিত সুযোগকে গোলের রূপ দিয়ে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের দুর্ভোগ

বিশ্বকাপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স হতাশাজনক।

গত কয়েকটি বিশ্বকাপে—

  1. ২০০৬ সালে কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হার।
  2. ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে বিদায়।
  3. ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে ঐতিহাসিক ৭-১ ব্যবধানে পরাজয়।
  4. ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার-ফাইনালে হার।
  5. ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়।
  6. এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে পরাজয়।

অর্থাৎ বিশ্বকাপে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষই বারবার ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হেক্সা মিশন আবারও ব্যর্থ

২০০২ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ব্রাজিলের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ষষ্ঠ শিরোপা—যাকে তারা “হেক্সা” নামে আখ্যা দেয়।

কিন্তু ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং এবার ২০২৬—টানা ছয়টি বিশ্বকাপেই সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেল।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না দলটি।

নতুন করে প্রশ্নের মুখে ব্রাজিল

এই হারের পর ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন, কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে—

  1. রক্ষণভাগের দুর্বলতা
  2. সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতা
  3. বড় ম্যাচে মানসিক চাপ সামলাতে না পারা
  4. কৌশলগত পরিবর্তনে ধীরগতি

এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নরওয়ের জন্য ঐতিহাসিক জয়

অন্যদিকে এই জয় নরওয়ে ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

Erling Haaland-এর নেতৃত্বে দলটি শুধু ব্রাজিলকেই বিদায় করেনি, নিজেদের বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সামনে কী ব্রাজিলের?

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর এখন ব্রাজিলের সামনে শুরু হবে আত্মসমালোচনার অধ্যায়। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দল পুনর্গঠন, তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়া এবং কৌশলগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

৩৬ বছর আগে আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলো থেকে বিদায় ছিল এক বেদনাদায়ক স্মৃতি। এত বছর পর সেই একই অধ্যায়ের নতুন সংস্করণ লিখল নরওয়ে। হেক্সার স্বপ্ন আবারও অপূর্ণ থেকে গেল, আর বিশ্ব ফুটবল পেল নতুন এক চমকপ্রদ গল্প।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল এক ব্যর্থতা

ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি আসরেই তারা নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রমাণ করেছে। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তারা আরও দুটি ফাইনাল খেলেছে এবং বহুবার সেমিফাইনালে উঠেছে।

এই ধারাবাহিকতার কারণেই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ব্রাজিলের দ্রুত বিদায় সবসময়ই বড় চমক হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৯০ সালের স্মৃতি আবার ফিরে এলো

৩৬ বছর আগে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল ছিল অন্যতম ফেবারিট। কিন্তু শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল।

সেই ম্যাচে  দিয়েগো ম্যারাডোনা (Diego Maradona) মাঝমাঠ থেকে দুর্দান্ত এক দৌড়ে কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল বাড়িয়ে দেন ক্লদিও ক্যানিজিয়া (Claudio Caniggia)-এর কাছে। ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলেই শেষ হয়ে যায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান।

এরপর টানা আটটি বিশ্বকাপে ব্রাজিল কখনও কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে বিদায় নেয়নি। সেই দীর্ঘ রেকর্ড এবার ভেঙে দিল নরওয়ে।

টানা আট বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স

  1. ১৯৯৪ – 🏆 চ্যাম্পিয়ন
  2. ১৯৯৮ – রানার্সআপ
  3. ২০০২ – 🏆 চ্যাম্পিয়ন
  4. ২০০৬ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  5. ২০১০ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  6. ২০১৪ – সেমিফাইনাল
  7. ২০১৮ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  8. ২০২২ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  9. ২০২৬ – শেষ ষোলো (নরওয়ের কাছে পরাজয়)

এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কতটা ধারাবাহিক ছিল ব্রাজিল। আর সেই ধারাবাহিকতাই এবার থেমে গেল।

ইউরোপের বিপক্ষে কেন বারবার ব্যর্থ ব্রাজিল?

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় দলগুলোর কৌশলগত ফুটবল, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, উচ্চমানের ফিটনেস এবং সংগঠিত রক্ষণভাগের বিপক্ষে ব্রাজিল বারবার সমস্যায় পড়ছে।

বিশেষ করে—

  1. ফ্রান্স
  2. নেদারল্যান্ডস
  3. জার্মানি
  4. বেলজিয়াম
  5. ক্রোয়েশিয়া
  6. নরওয়ে

এই দলগুলোর বিপক্ষে বড় ম্যাচে কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স দিতে পারেনি ব্রাজিল।

নরওয়ের উত্থান বিশ্ব ফুটবলে নতুন বার্তা

অনেক বছর ধরেই নরওয়েকে সম্ভাবনাময় দল বলা হলেও বড় টুর্নামেন্টে তারা তেমন সাফল্য পায়নি। তবে এবার তাদের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে যে তারা এখন ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর দল।

দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলেন Erling Haaland। তার গোল করার ক্ষমতা, শারীরিক শক্তি এবং নেতৃত্ব ব্রাজিলের রক্ষণকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে রেখেছিল।

শুধু হালান্ডই নন, পুরো নরওয়ে দলই ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। বল না থাকলেও তারা রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে গেছে।

ব্রাজিলের কোথায় ভুল ছিল?

বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে কয়েকটি বড় ভুল করেছে ব্রাজিল—

  1. মাঝমাঠে সৃজনশীলতার অভাব।
  2. ডিফেন্সে সমন্বয়ের ঘাটতি।
  3. গোলের সামনে সুযোগ নষ্ট।
  4. উইং থেকে আক্রমণে ধার কমে যাওয়া।
  5. নরওয়ের কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকাতে ব্যর্থতা।
  6. বদলি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে প্রত্যাশিত অবদান না পাওয়া।

সমর্থকদের হতাশা

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থক এই হারে হতাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ২০১৪ সালের জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের পরাজয়ের পর এটিকে সবচেয়ে কষ্টের বিশ্বকাপ বিদায় হিসেবে উল্লেখ করছেন।

ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলোও দলটির মানসিক দৃঢ়তা, রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং বড় ম্যাচে পরিকল্পনার ঘাটতিকে বিদায়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর এখন ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। আগামী চার বছরে তরুণ ফুটবলারদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া, রক্ষণভাগ শক্তিশালী করা এবং আধুনিক কৌশলের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার দিকেই নজর দিতে হবে।

অন্যদিকে নরওয়ে এই জয়ের মাধ্যমে শুধু কোয়ার্টার-ফাইনালেই ওঠেনি, পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এখন আর কেবল সম্ভাবনাময় দল নয়—বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়েও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।

৩৬ বছর আগে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার সেই ইতিহাসের নতুন সংস্করণ লিখল নরওয়ে। হেক্সা মিশন আবারও অধরা থেকে গেল, আর বিশ্ব ফুটবল পেল আরেকটি স্মরণীয় অঘটনের সাক্ষী।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিজিবিএ স্থায়ী কমিটি গঠন, ২০২৬-২৮ মেয়াদে ৬৬ কমিটির ঘোষণা

৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে কোয়ার্টারের আগেই বিদায় ব্রাজিল, এবার আর্জেন্টিনা নয়

Update Time : ০৫:৫৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলটির নামের পাশে রয়েছে পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপা। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে রয়েছে। ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলো থেকে বিদায় ছিল তেমনই একটি ঘটনা। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো—তবে এবার প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা নয়, ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শেষ ষোলো ম্যাচে নিউ জার্সির মাঠে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। এর মাধ্যমে হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল সেলেসাওদের।

৩৬ বছর পর ফিরল সেই তিক্ত স্মৃতি

ব্রাজিল সর্বশেষ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে বিদায় নিয়েছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। সেবার শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল তারা।

সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি Diego Maradona মাঝমাঠ থেকে অসাধারণ এক ড্রিবল করে বল বাড়িয়ে দেন Claudio Caniggia-কে। ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলেই বিদায় নেয় ব্রাজিল।

এরপর ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২—প্রতিটি বিশ্বকাপেই অন্তত কোয়ার্টার-ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল ব্রাজিল। কিন্তু এবার সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেল।

নরওয়ের কাছে হার, ইতিহাসের নতুন অধ্যায়

বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল নরওয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই তারা সাহসী ফুটবল খেলেছে।

নরওয়ের আক্রমণের মূল ভরসা ছিলেন এরলিং হালান্ড (Erling Haaland)। তার নেতৃত্বে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক বারবার চাপে ফেলে ব্রাজিলের রক্ষণকে।

ব্রাজিল বলের দখল বেশি রাখলেও সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে নরওয়ে সীমিত সুযোগকে গোলের রূপ দিয়ে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের দুর্ভোগ

বিশ্বকাপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স হতাশাজনক।

গত কয়েকটি বিশ্বকাপে—

  1. ২০০৬ সালে কোয়ার্টার-ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হার।
  2. ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে বিদায়।
  3. ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে ঐতিহাসিক ৭-১ ব্যবধানে পরাজয়।
  4. ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার-ফাইনালে হার।
  5. ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়।
  6. এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে পরাজয়।

অর্থাৎ বিশ্বকাপে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষই বারবার ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হেক্সা মিশন আবারও ব্যর্থ

২০০২ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ব্রাজিলের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ষষ্ঠ শিরোপা—যাকে তারা “হেক্সা” নামে আখ্যা দেয়।

কিন্তু ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং এবার ২০২৬—টানা ছয়টি বিশ্বকাপেই সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেল।

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না দলটি।

নতুন করে প্রশ্নের মুখে ব্রাজিল

এই হারের পর ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন, কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে—

  1. রক্ষণভাগের দুর্বলতা
  2. সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতা
  3. বড় ম্যাচে মানসিক চাপ সামলাতে না পারা
  4. কৌশলগত পরিবর্তনে ধীরগতি

এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নরওয়ের জন্য ঐতিহাসিক জয়

অন্যদিকে এই জয় নরওয়ে ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

Erling Haaland-এর নেতৃত্বে দলটি শুধু ব্রাজিলকেই বিদায় করেনি, নিজেদের বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সামনে কী ব্রাজিলের?

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর এখন ব্রাজিলের সামনে শুরু হবে আত্মসমালোচনার অধ্যায়। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দল পুনর্গঠন, তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়া এবং কৌশলগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

৩৬ বছর আগে আর্জেন্টিনার কাছে শেষ ষোলো থেকে বিদায় ছিল এক বেদনাদায়ক স্মৃতি। এত বছর পর সেই একই অধ্যায়ের নতুন সংস্করণ লিখল নরওয়ে। হেক্সার স্বপ্ন আবারও অপূর্ণ থেকে গেল, আর বিশ্ব ফুটবল পেল নতুন এক চমকপ্রদ গল্প।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল এক ব্যর্থতা

ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি আসরেই তারা নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রমাণ করেছে। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তারা আরও দুটি ফাইনাল খেলেছে এবং বহুবার সেমিফাইনালে উঠেছে।

এই ধারাবাহিকতার কারণেই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ব্রাজিলের দ্রুত বিদায় সবসময়ই বড় চমক হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৯০ সালের স্মৃতি আবার ফিরে এলো

৩৬ বছর আগে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল ছিল অন্যতম ফেবারিট। কিন্তু শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল।

সেই ম্যাচে  দিয়েগো ম্যারাডোনা (Diego Maradona) মাঝমাঠ থেকে দুর্দান্ত এক দৌড়ে কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল বাড়িয়ে দেন ক্লদিও ক্যানিজিয়া (Claudio Caniggia)-এর কাছে। ক্যানিজিয়ার একমাত্র গোলেই শেষ হয়ে যায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ অভিযান।

এরপর টানা আটটি বিশ্বকাপে ব্রাজিল কখনও কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে বিদায় নেয়নি। সেই দীর্ঘ রেকর্ড এবার ভেঙে দিল নরওয়ে।

টানা আট বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স

  1. ১৯৯৪ – 🏆 চ্যাম্পিয়ন
  2. ১৯৯৮ – রানার্সআপ
  3. ২০০২ – 🏆 চ্যাম্পিয়ন
  4. ২০০৬ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  5. ২০১০ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  6. ২০১৪ – সেমিফাইনাল
  7. ২০১৮ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  8. ২০২২ – কোয়ার্টার-ফাইনাল
  9. ২০২৬ – শেষ ষোলো (নরওয়ের কাছে পরাজয়)

এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কতটা ধারাবাহিক ছিল ব্রাজিল। আর সেই ধারাবাহিকতাই এবার থেমে গেল।

ইউরোপের বিপক্ষে কেন বারবার ব্যর্থ ব্রাজিল?

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় দলগুলোর কৌশলগত ফুটবল, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, উচ্চমানের ফিটনেস এবং সংগঠিত রক্ষণভাগের বিপক্ষে ব্রাজিল বারবার সমস্যায় পড়ছে।

বিশেষ করে—

  1. ফ্রান্স
  2. নেদারল্যান্ডস
  3. জার্মানি
  4. বেলজিয়াম
  5. ক্রোয়েশিয়া
  6. নরওয়ে

এই দলগুলোর বিপক্ষে বড় ম্যাচে কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স দিতে পারেনি ব্রাজিল।

নরওয়ের উত্থান বিশ্ব ফুটবলে নতুন বার্তা

অনেক বছর ধরেই নরওয়েকে সম্ভাবনাময় দল বলা হলেও বড় টুর্নামেন্টে তারা তেমন সাফল্য পায়নি। তবে এবার তাদের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে যে তারা এখন ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর দল।

দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিলেন Erling Haaland। তার গোল করার ক্ষমতা, শারীরিক শক্তি এবং নেতৃত্ব ব্রাজিলের রক্ষণকে পুরো ম্যাচজুড়ে চাপে রেখেছিল।

শুধু হালান্ডই নন, পুরো নরওয়ে দলই ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। বল না থাকলেও তারা রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে গেছে।

ব্রাজিলের কোথায় ভুল ছিল?

বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে কয়েকটি বড় ভুল করেছে ব্রাজিল—

  1. মাঝমাঠে সৃজনশীলতার অভাব।
  2. ডিফেন্সে সমন্বয়ের ঘাটতি।
  3. গোলের সামনে সুযোগ নষ্ট।
  4. উইং থেকে আক্রমণে ধার কমে যাওয়া।
  5. নরওয়ের কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকাতে ব্যর্থতা।
  6. বদলি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে প্রত্যাশিত অবদান না পাওয়া।

সমর্থকদের হতাশা

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থক এই হারে হতাশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ২০১৪ সালের জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের পরাজয়ের পর এটিকে সবচেয়ে কষ্টের বিশ্বকাপ বিদায় হিসেবে উল্লেখ করছেন।

ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলোও দলটির মানসিক দৃঢ়তা, রক্ষণভাগের দুর্বলতা এবং বড় ম্যাচে পরিকল্পনার ঘাটতিকে বিদায়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর এখন ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। আগামী চার বছরে তরুণ ফুটবলারদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া, রক্ষণভাগ শক্তিশালী করা এবং আধুনিক কৌশলের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার দিকেই নজর দিতে হবে।

অন্যদিকে নরওয়ে এই জয়ের মাধ্যমে শুধু কোয়ার্টার-ফাইনালেই ওঠেনি, পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এখন আর কেবল সম্ভাবনাময় দল নয়—বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়েও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম।

৩৬ বছর আগে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এবার সেই ইতিহাসের নতুন সংস্করণ লিখল নরওয়ে। হেক্সা মিশন আবারও অধরা থেকে গেল, আর বিশ্ব ফুটবল পেল আরেকটি স্মরণীয় অঘটনের সাক্ষী।