ঢাকা ১০:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদারে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর Logo মেসির স্ত্রীকে রোনালদোর বান্ধবীর বিশেষ উপহার, যা জানালেন Logo প্রেগন্যান্সি কিটে হালকা দাগ কেন? জানুন আসল কারণ Logo এনআইডি সংশোধন নতুন নিয়ম, যা জানা জরুরি Logo রোনালদো কেন সাংবাদিককে বললেন ‘ভালো প্রশ্ন করুন’? Logo পরিশ্রম না করেও সারাক্ষণ ঘুম পায়? জেনে নিন কারণ Logo ট্রাম্পের এফ-৩৫ পরিকল্পনায় ক্ষুব্ধ নেতানিয়াহু, তুরস্ককে কড়া বার্তা Logo বিয়ের প্রথম রাতে ভয় কাটাতে নারীদের যা জানা জরুরি Logo গাজার প্রশাসনিক কমিটি ভেঙে দেওয়া, হামাসের নতুন সিদ্ধান্তে গাজা শাসনে বড় পরিবর্তন Logo ওয়ানডেতেও লজ্জার হারে সিরিজ শুরু বাংলাদেশের

২৫০ বছরে কেন এত বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্র? ট্রাম্প কি মূল কারণ?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:০১:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৩

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প । ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আলোচনায়। বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব এখন শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল এই মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে।

একসময় স্বাধীনতা দিবস যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও এবার সেই আবহ অনেকটাই ম্লান। লাল ও নীল—দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে বিভাজন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর উদ্‌যাপনও রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ফলে ঐতিহাসিক এই মাইলফলক উদ্‌যাপনের মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের বদলে বিভক্তির চিত্রই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট পরিমাপ করা সহজ নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যভেদে নীতিগত দূরত্ব বৃদ্ধি, কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সহযোগিতার সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সংঘাত—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র আবারও গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অবশ্য ইতিহাস বলছে, এমন বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি নানা সময় আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক, বর্ণগত ও রাজনৈতিক বিরোধের মুখোমুখি হয়েছে। তবে গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ সময় বাদ দিলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য সামাল দেওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে। যদিও সেই সমাধান কখনোই স্থায়ী হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভূমিকা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, পূর্বসূরিদের তুলনায় ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি বিদ্যমান মতবিরোধকে কমানোর পরিবর্তে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আরও উসকে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ও নীতির কারণে দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির সাবেক ডিন ডোনাল্ড কেটল বলেন, বর্তমান সংকটের বিশেষত্ব শুধু বিভাজনের অস্তিত্বে নয়, বরং দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ভূমিকার মধ্যেও নিহিত। তাঁর মতে, এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক বিভাজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে আরও তীব্র করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী কোনো রাজনৈতিক ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন প্রশ্নে দেশটি বিভক্ত ছিল। তবে কিছু সময় সেই মতবিরোধ জাতীয় সংকটে রূপ নেয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের গৃহযুদ্ধ।

১৮৪০ ও ১৮৫০-এর দশকে দাসপ্রথা নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণের বিরোধ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাত শুধু রাজনীতিকেই নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিভক্ত করে দেয়। যুদ্ধ শেষ হলেও উত্তেজনা থেমে থাকেনি।

গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পর্ব শেষ হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ‘জিম ক্রো’ নামে পরিচিত বর্ণবাদী আইন চালু হয়। ১৮৭৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার সীমিত করা হয় এবং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কঠোর জাতিগত বিভাজন বজায় রাখা হয়।

ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটের ইতিহাসবিদ মনীষা সিনহার মতে, ১৮৭৬ সালের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্‌যাপনও প্রকৃত অর্থে জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতীক ছিল না। বরং তখনও দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার ধারাবাহিকভাবে খর্ব করা হচ্ছিল। ফলে জাতীয় উৎসবের আড়ালেও গভীর সামাজিক সংকট বিদ্যমান ছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, গৃহযুদ্ধ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েকবার বড় রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। প্রথম বড় সংকট শুরু হয় ১৮০০ সালের দিকে। তখন দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা কল্পনা না করলেও দ্রুত দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শিবির গড়ে ওঠে।

একদিকে ছিলেন জন অ্যাডামস ও আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের নেতৃত্বাধীন ফেডারেলিস্টরা। অন্যদিকে টমাস জেফারসন ও জেমস ম্যাডিসনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ডেমোক্র্যাটিক-রিপাবলিকান পার্টি। পররাষ্ট্রনীতি, শুল্ক ও কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়।

১৭৯৮ সালে অ্যাডামস প্রশাসনের এলিয়েন অ্যান্ড সেডিশন অ্যাক্টস রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকারবিরোধী মত প্রকাশের অভিযোগে সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং একজন কংগ্রেস সদস্যের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। অনেক গবেষক এটিকে রাজনৈতিক বিরোধীদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরে ব্রেটস্নাইডারের মতে, ওই সময় নাগরিকদের দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল। একদিকে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত নাগরিক, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির। যদিও ১৮০০ সালে জেফারসন ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

তবে ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও চরমে ওঠে। ফেডারেলিস্টরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং কয়েকজন গভর্নর সেনা পাঠাতেও অস্বীকৃতি জানান। এমনকি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল, যা পরে দলটির পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তুলনা করা হয় ১৯৬০-এর দশকের। সে সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, বর্ণগত দাঙ্গা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং উগ্রপন্থী সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় অস্থির করে রেখেছিল।

এই সংকট ১৯৭০-এর দশকেও অব্যাহত ছিল। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবে ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনে জাতীয় পুনর্মিলনের একটি বার্তা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো ঐক্যের বার্তা প্রায় অনুপস্থিত।

রক্ষণশীল গবেষক ইউভাল লেভিন অবশ্য মনে করেন, বর্তমান বিভাজন অতীতের কিছু সংকটের মতো ততটা ভয়াবহ নয়। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০-৫০ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসবাস করছে, যেখানে কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান বিভাজনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এর আদর্শিক গভীরতা। অভিবাসন, গর্ভপাত, এলজিবিটিকিউ অধিকার, শিক্ষা, পরিবেশনীতি, বৈচিত্র্য এবং নাগরিক পরিচয়ের মতো প্রশ্নে দুই রাজনৈতিক শিবিরের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিপরীতমুখী।

এই বিভাজনের প্রভাব শুধু জাতীয় রাজনীতিতে নয়, অঙ্গরাজ্যগুলোর নীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত ও ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোর মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ফলে একই দেশের ভেতরে দুই ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নিজেকে পুরো দেশের প্রেসিডেন্টের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক সমর্থকদের নেতা হিসেবেই বেশি তুলে ধরেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্য ও শহরগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফেডারেল ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন।

সমালোচকদের দাবি, কোথাও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কোথাও তদন্তের নির্দেশ, আবার কোথাও অর্থায়ন বন্ধের উদ্যোগ রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। যদিও এসব পদক্ষেপের অনেকগুলোই আদালতের বাধার মুখে পড়েছে।

একই সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা প্রায়ই ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ কিংবা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছেন। ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিংকলের মতে, বিরোধী রাজনৈতিক অঞ্চলকে শাস্তি দেওয়ার এমন ধারণা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য বড় হুমকি এবং এটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরে ব্রেটস্নাইডার মনে করেন, ট্রাম্পের রাজনীতিতে অতীতের কয়েকজন বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ মনীষা সিনহার মতে, যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নাগরিকত্ব বা বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে, তখন সেটি গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

২৫০ বছরে পদার্পণ করা যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভোটাররা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারা প্রত্যাখ্যান করবেন, নাকি সেটিই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের পথচলা।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদারে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২৫০ বছরে কেন এত বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্র? ট্রাম্প কি মূল কারণ?

Update Time : ০৭:০১:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আলোচনায়। বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্ব এখন শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল এই মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে।

একসময় স্বাধীনতা দিবস যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও এবার সেই আবহ অনেকটাই ম্লান। লাল ও নীল—দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে বিভাজন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর উদ্‌যাপনও রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ফলে ঐতিহাসিক এই মাইলফলক উদ্‌যাপনের মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের বদলে বিভক্তির চিত্রই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট পরিমাপ করা সহজ নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যভেদে নীতিগত দূরত্ব বৃদ্ধি, কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সহযোগিতার সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের সংঘাত—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র আবারও গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অবশ্য ইতিহাস বলছে, এমন বিভাজন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি নানা সময় আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক, বর্ণগত ও রাজনৈতিক বিরোধের মুখোমুখি হয়েছে। তবে গৃহযুদ্ধের মতো ভয়াবহ সময় বাদ দিলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য সামাল দেওয়ার পথ খুঁজে পেয়েছে। যদিও সেই সমাধান কখনোই স্থায়ী হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভূমিকা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, পূর্বসূরিদের তুলনায় ট্রাম্প এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি বিদ্যমান মতবিরোধকে কমানোর পরিবর্তে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আরও উসকে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ও নীতির কারণে দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির সাবেক ডিন ডোনাল্ড কেটল বলেন, বর্তমান সংকটের বিশেষত্ব শুধু বিভাজনের অস্তিত্বে নয়, বরং দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ভূমিকার মধ্যেও নিহিত। তাঁর মতে, এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক বিভাজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে আরও তীব্র করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন  কেন ব্রাজিলের জন্য আতঙ্ক নরওয়ে?

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী কোনো রাজনৈতিক ‘স্বর্ণযুগ’ ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন প্রশ্নে দেশটি বিভক্ত ছিল। তবে কিছু সময় সেই মতবিরোধ জাতীয় সংকটে রূপ নেয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের গৃহযুদ্ধ।

১৮৪০ ও ১৮৫০-এর দশকে দাসপ্রথা নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণের বিরোধ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাত শুধু রাজনীতিকেই নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোকেও বিভক্ত করে দেয়। যুদ্ধ শেষ হলেও উত্তেজনা থেমে থাকেনি।

গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন পর্ব শেষ হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে ‘জিম ক্রো’ নামে পরিচিত বর্ণবাদী আইন চালু হয়। ১৮৭৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার সীমিত করা হয় এবং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কঠোর জাতিগত বিভাজন বজায় রাখা হয়।

ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটের ইতিহাসবিদ মনীষা সিনহার মতে, ১৮৭৬ সালের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্‌যাপনও প্রকৃত অর্থে জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতীক ছিল না। বরং তখনও দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার ধারাবাহিকভাবে খর্ব করা হচ্ছিল। ফলে জাতীয় উৎসবের আড়ালেও গভীর সামাজিক সংকট বিদ্যমান ছিল।

ইতিহাসবিদদের মতে, গৃহযুদ্ধ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েকবার বড় রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। প্রথম বড় সংকট শুরু হয় ১৮০০ সালের দিকে। তখন দেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা কল্পনা না করলেও দ্রুত দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শিবির গড়ে ওঠে।

একদিকে ছিলেন জন অ্যাডামস ও আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের নেতৃত্বাধীন ফেডারেলিস্টরা। অন্যদিকে টমাস জেফারসন ও জেমস ম্যাডিসনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ডেমোক্র্যাটিক-রিপাবলিকান পার্টি। পররাষ্ট্রনীতি, শুল্ক ও কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়।

আরও পড়ুন  ইরান চুক্তি ঘিরে ট্রাম্পকে কড়া সমালোচনা, ডেমোক্র্যাটদের প্রশ্নে উত্তপ্ত ওয়াশিংটন

১৭৯৮ সালে অ্যাডামস প্রশাসনের এলিয়েন অ্যান্ড সেডিশন অ্যাক্টস রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকারবিরোধী মত প্রকাশের অভিযোগে সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং একজন কংগ্রেস সদস্যের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। অনেক গবেষক এটিকে রাজনৈতিক বিরোধীদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরে ব্রেটস্নাইডারের মতে, ওই সময় নাগরিকদের দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল। একদিকে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুগত নাগরিক, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির। যদিও ১৮০০ সালে জেফারসন ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

তবে ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও চরমে ওঠে। ফেডারেলিস্টরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করেন এবং কয়েকজন গভর্নর সেনা পাঠাতেও অস্বীকৃতি জানান। এমনকি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল, যা পরে দলটির পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তুলনা করা হয় ১৯৬০-এর দশকের। সে সময় নাগরিক অধিকার আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ, বর্ণগত দাঙ্গা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং উগ্রপন্থী সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় অস্থির করে রেখেছিল।

এই সংকট ১৯৭০-এর দশকেও অব্যাহত ছিল। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবে ১৯৭৬ সালের দ্বিশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনে জাতীয় পুনর্মিলনের একটি বার্তা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো ঐক্যের বার্তা প্রায় অনুপস্থিত।

রক্ষণশীল গবেষক ইউভাল লেভিন অবশ্য মনে করেন, বর্তমান বিভাজন অতীতের কিছু সংকটের মতো ততটা ভয়াবহ নয়। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫০-৫০ রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসবাস করছে, যেখানে কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান বিভাজনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এর আদর্শিক গভীরতা। অভিবাসন, গর্ভপাত, এলজিবিটিকিউ অধিকার, শিক্ষা, পরিবেশনীতি, বৈচিত্র্য এবং নাগরিক পরিচয়ের মতো প্রশ্নে দুই রাজনৈতিক শিবিরের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিপরীতমুখী।

আরও পড়ুন  মমতা পদত্যাগ না করলে বরখাস্ত হতে পারেন

এই বিভাজনের প্রভাব শুধু জাতীয় রাজনীতিতে নয়, অঙ্গরাজ্যগুলোর নীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত ও ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোর মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতির ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ফলে একই দেশের ভেতরে দুই ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নিজেকে পুরো দেশের প্রেসিডেন্টের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক সমর্থকদের নেতা হিসেবেই বেশি তুলে ধরেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত রাজ্য ও শহরগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফেডারেল ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন।

সমালোচকদের দাবি, কোথাও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কোথাও তদন্তের নির্দেশ, আবার কোথাও অর্থায়ন বন্ধের উদ্যোগ রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। যদিও এসব পদক্ষেপের অনেকগুলোই আদালতের বাধার মুখে পড়েছে।

একই সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা প্রায়ই ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, বিদ্রোহ কিংবা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছেন। ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিংকলের মতে, বিরোধী রাজনৈতিক অঞ্চলকে শাস্তি দেওয়ার এমন ধারণা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য বড় হুমকি এবং এটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরে ব্রেটস্নাইডার মনে করেন, ট্রাম্পের রাজনীতিতে অতীতের কয়েকজন বিতর্কিত প্রেসিডেন্টের বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে দেখা যায়। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ মনীষা সিনহার মতে, যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নাগরিকত্ব বা বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে, তখন সেটি গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

২৫০ বছরে পদার্পণ করা যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভোটাররা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারা প্রত্যাখ্যান করবেন, নাকি সেটিই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হবে—সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী দিনের পথচলা।