কারওয়ান বাজারে জলাবদ্ধতা রাজধানী ঢাকার পুরোনো সমস্যাগুলোর একটি। বর্ষা এলেই এই এলাকার সড়ক, ফুটপাত ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ক্রেতা, পথচারী ও যানবাহনের পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়ে অসংখ্য পথকুকুর, বিড়াল এবং অন্যান্য অবলা প্রাণীও।
শুক্রবার সকালে কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণের পর কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। সড়কের নিচে লুকিয়ে থাকা খানাখন্দে পড়ে অনেকেই আহত হওয়ার আশঙ্কায় ধীরগতিতে চলাচল করেন। বাজারে আসা পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানগুলোকেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে দেখা দেয় স্থবিরতা।
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র
কারওয়ান বাজার শুধু একটি কাঁচাবাজার নয়; এটি ঢাকার অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ, সবজি, ফল, মাংস, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যসহ অসংখ্য পণ্য এখানে আসে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাজারো মানুষ জীবিকার তাগিদে এই এলাকায় কাজ করেন।
কিন্তু বর্ষাকালে পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সড়ক পানিতে ডুবে যায়। অনেক সময় দোকানের সামনেও পানি উঠে যায়, ফলে পণ্য ওঠানামা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
খানাখন্দে বাড়ছে ঝুঁকি
জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সড়কের খানাখন্দ। পানি জমে থাকায় কোথায় গর্ত আর কোথায় সমান রাস্তা—তা বোঝার উপায় থাকে না।
রিকশা, মোটরসাইকেল ও সাইকেল আরোহীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক সময় হঠাৎ গর্তে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে। পথচারীদেরও কাদাপানির মধ্যে সতর্ক হয়ে হাঁটতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা শুরুর আগে সড়ক সংস্কার করা হলেও অনেক জায়গায় কাজ টেকসই হয় না।
ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা
কারওয়ান বাজারের অধিকাংশ পণ্য দ্রুত বিক্রি করতে হয়। বিশেষ করে মাছ, সবজি ও ফল দীর্ঘ সময় রাখা যায় না।
জলাবদ্ধতার কারণে ট্রাক সময়মতো বাজারে প্রবেশ করতে না পারলে পণ্য খালাসে দেরি হয়। এতে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ গুনতে হয়। অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায় কাঁচা পণ্যও।
একজন সবজি ব্যবসায়ী বলেন, বৃষ্টি হলে ক্রেতা কমে যায়। আবার যারা আসেন, তাদেরও বাজার করতে অনেক কষ্ট হয়। এতে বিক্রি কমে যায়।
পথচারীদের দুর্ভোগ
কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন হাজারো অফিসগামী মানুষ যাতায়াত করেন। আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম কার্যালয় ও বাণিজ্যিক ভবন।
জলাবদ্ধতার কারণে ফুটপাত ব্যবহার করা যায় না। অনেকেই বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
কাদাপানি ছিটকে পোশাক নষ্ট হওয়া, জুতায় পানি ঢুকে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার মতো সমস্যাও নিয়মিত ঘটছে।
দুর্ভোগে অবলা প্রাণী
এই জলাবদ্ধতার সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী হলো পথের অবলা প্রাণীগুলো।
কারওয়ান বাজার এলাকায় অসংখ্য পথকুকুর ও বিড়াল বাস করে। অনেক সময় বৃষ্টির পানি জমে তাদের আশ্রয়স্থল ডুবে যায়। খাবারের সন্ধানেও বের হতে পারে না তারা।
বাজারের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, কুকুরগুলো শুকনো জায়গা খুঁজে দোকানের ছাউনি কিংবা ভবনের বারান্দায় আশ্রয় নিচ্ছে। অনেক বিড়াল ভেজা অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে নিরাপদ স্থানের খোঁজ করছে।
কিছু প্রাণীপ্রেমী নিয়মিত খাবার দিলেও জলাবদ্ধতার কারণে তাদের কাছে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
জলাবদ্ধতার মূল কারণ
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কারওয়ান বাজারে জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ।
- অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা
- ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য
- অবৈধ দখল
- নিয়মিত পরিষ্কারের অভাব
- অতিরিক্ত নগরায়ণ
- অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি
এছাড়া প্লাস্টিক, পলিথিন ও বিভিন্ন বর্জ্য ড্রেনে আটকে থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না।
যানজটে স্থবির সড়ক
বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরপরই কারওয়ান বাজার এলাকায় যানজট দেখা দেয়।
ধীরগতিতে যান চলাচল, পানি জমে থাকা এবং গর্ত এড়িয়ে চলার কারণে যানবাহনের গতি কমে যায়। অফিস শেষ হওয়ার সময় এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
বাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি, রিকশা—সব ধরনের যানবাহন দীর্ঘ সারিতে আটকে থাকে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চলাচলের সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ে।
নোংরা পানিতে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। এতে চর্মরোগ, ডায়রিয়া, জ্বর ও বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তারও দ্রুত হয়, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
কী বলছেন স্থানীয়রা?
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের দাবি, প্রতিবছর একই চিত্র দেখা গেলেও কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না।
তাদের মতে—
- ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
- স্থায়ীভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
- ভাঙা সড়ক দ্রুত সংস্কার করতে হবে।
- ড্রেন দখলমুক্ত রাখতে হবে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরুরি ভিত্তিতে পানি সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, টেকসই সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব নয়।
বিশেষ করে কারওয়ান বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
অবলা প্রাণীর জন্যও প্রয়োজন উদ্যোগ
প্রাণীকল্যাণকর্মীরা বলছেন, দুর্যোগের সময় শুধু মানুষের নিরাপত্তা নয়, পথের প্রাণীদের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বাজার এলাকায় নির্দিষ্ট শুকনো আশ্রয়স্থল, পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করলে অনেক প্রাণী বেঁচে যেতে পারে।
নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রাণীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গিও যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কারওয়ান বাজারে জলাবদ্ধতা শুধু একটি মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি রাজধানীর অবকাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র অচল হয়ে পড়ে, তখন এর প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, যান চলাচল, জনজীবন এবং প্রাণিকুলের ওপর।
সড়কের খানাখন্দ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার ঘাটতি দূর করা না গেলে প্রতি বর্ষায় একই চিত্র ফিরে আসবে। তাই নগর কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধতামুক্ত কারওয়ান বাজার শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, রাজধানীর প্রতিটি মানুষের জন্যই প্রয়োজন।



























