কানাডার পাল্টা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা নতুন শুল্কের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটির সরকার।
কানাডা সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য এই পাল্টা শুল্কের আওতায় আসবে। তালিকায় রয়েছে ইস্পাত, আসবাবপত্র, তাজা টুনা মাছ, কটন টি-শার্টসহ বিভিন্ন পণ্য। কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পাল্টা পণ্যের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের জবাব দিতেই অটোয়াকে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, নতুন মার্কিন শুল্কের প্রভাব কানাডার শ্রমিক, ব্যবসা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির ওপর পড়বে। তাই ক্ষতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শুধু শুল্ক আরোপ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সহায়তায় অতিরিক্ত ৭৫০ কোটি কানাডিয়ান ডলার দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে। কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং মার্কিন শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করতেই এই অর্থ ব্যয় করা হবে। অর্থাৎ কানাডা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে শুল্ক বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে অভ্যন্তরীণ সহায়তা বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতির শুরু হয়েছে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর। গত সপ্তাহে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিভিন্ন পণ্যে নতুন করে শুল্ক আরোপ করে। আলোচনার ব্যর্থতার জন্য ওয়াশিংটন ও অটোয়া একে অপরকে দায়ী করেছে। দুই পক্ষের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে এমন কিছু দাবি তোলা হয়েছিল, যা গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।
কানাডার পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর দেশটির ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ বেড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। নতুন করে শুল্ক বাড়লে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউস কানাডার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সাম্প্রতিক আলোচনায় কানাডাকে অত্যন্ত সুবিধাজনক বাজার-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কানাডা সেই সুযোগ গ্রহণ না করে অযৌক্তিক অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য বাণিজ্য করছে এবং মার্কিন কৃষকদের ওপরও উচ্চ শুল্ক আরোপ করছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প এর আগে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর শুল্ক আরও বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছেন। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এই শুল্ক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেছেন তিনি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের লক্ষ্য কানাডার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত। বিশেষ করে গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্প নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
কানাডার পাল্টা শুল্কের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উত্তর আমেরিকার শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে শুল্ক বাড়লে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও প্রস্তুত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্য বাজার ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেছেন, দুই দেশই এমন একটি চুক্তি চায়, যা আমেরিকান ও কানাডীয় উভয় জনগণের জন্য ভালো হবে। তাঁর বক্তব্যকে দুই পক্ষের মধ্যে আবার আলোচনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন এই শুল্ক বিরোধে উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে কার্যকর ইউএসএমসিএ চুক্তি ভবিষ্যতে কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সময়ে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা সামাল দিতে মেক্সিকোও সক্রিয় হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম অর্থমন্ত্রী মার্সেলো এব্রার্ডকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছেন আলোচনার জন্য।
সব মিলিয়ে কানাডার পাল্টা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করেছে। দুই দেশের সরকার কঠোর অবস্থান নিলেও ব্যবসা, শ্রমিক ও ভোক্তাদের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথেই ফিরতে হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন বেশি। দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে সমঝোতার উদ্যোগ না এলে উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।




























