মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন করে আরও পৌনে দুই লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সভাপতিত্ব করেন বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে তেল আমদানির প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিপুল পরিমাণ এই জ্বালানি তেল আমদানির জন্য সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৯৮ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আমদানিকৃত তেলের তালিকায় রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার মেট্রিক টন উচ্চমানের অকটেন যা দেশের পরিবহন খাতে গতি আনবে। মূলত ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটেই এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই জ্বালানি সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিবিএস ট্রেডিং হাউস এফজেডসিও নামক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার মেট্রিক টন গ্যাসোলিন বা অকটেন কেনা হবে। এই নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি আমদানির পেছনে সরকারের খরচ হবে ১ হাজার ২৩ কোটি ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি আর্চার এনার্জি এলএলসি নামক অপর একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও বড় অংকের জ্বালানি তেল আমদানির আরেকটি আলাদা প্রস্তাব বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ লাখ মেট্রিক টন সালফারযুক্ত উন্নত মানের ডিজেল আমদানি করবে সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিভাগ।
আর্চার এনার্জি থেকে আমদানিকৃত এই বিশাল পরিমাণ ডিজেলের জন্য সরকারের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যয় করতে হবে আরও ৬৭৪ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে প্রতিটি ক্রয় কমিটির বৈঠকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টি নিয়মিত অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে স্থান পাচ্ছে। জ্বালানি খাতের পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ঢাকা ওয়াসার একটি বড় প্রকল্পের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের বিষয়েও চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছে মন্ত্রিসভা কমিটি। ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা ও নকশা তদারকির জন্য এই নতুন পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
জার্মানি ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফিখ্টনার জিএমবিএইচ অ্যান্ড কো. কেজি আগামী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে পরবর্তী ২৪ মাসের জন্য এই প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করবে। এই সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৬ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার ৮৫৫ টাকা।স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে আসা এই প্রস্তাবটি শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এবং পরিবেশবান্ধব পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা শহরের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে এই অভিজ্ঞ বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি।
একই বৈঠকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৩ কোটি পিস নতুন হেসিয়ান বস্তা কেনার একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সুবিধার্থে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ই-জিপি সিস্টেমে এই বিশাল পরিমাণ বস্তা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। মোট ৭৫টি প্যাকেজের মাধ্যমে এই হেসিয়ান বস্তাগুলো কেনা হবে যার জন্য সরকারের ব্যয় হবে ২১৫ কোটি ৬৪ লাখ ৮২ হাজার ১৬৪ টাকা। মোট ১৯টি দরদাতা প্রতিষ্ঠান এই সরবরাহ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সরকারের কাছে ৩০ কেজি ধারণক্ষমতার মজবুত এই বস্তাগুলো পৌঁছে দেবে।
জ্বালানি তেলের এই বড় বিনিয়োগ এবং খাদ্য শস্য সংরক্ষণের প্রস্তুতি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাবে যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থমকে না যায় সেজন্য এই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বিশেষ সহায়ক হবে।আমদানিকৃত এই তেল দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে নিয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে কোনো ঘাটতি না ঘটে। বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে আরও এমন কৌশলগত ক্রয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকারি এই মন্ত্রিসভা কমিটি।





























