আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন কমিশনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রস্তুতি এখনো পুরোপুরি শেষ না হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় কমিশন।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে প্রয়োজনীয় আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধনের কাজও চলছে। কমিশন চায় পুরো প্রক্রিয়াটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে।
নির্বাচন কমিশনার জানান, এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে কোন নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সবদিক বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ৫ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে একই ধরনের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন শেষ করার চেষ্টা করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে বলে জানান তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে সাধারণত ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। কারণ এসব নির্বাচন সারা দেশে একযোগে নয়, বরং ধাপে ধাপে আয়োজন করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ভোটকেন্দ্র ও আইনগত কাঠামো অনুসরণ করতে হয়। ফলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে শুরু হতে পারে এবং কোন ধাপে কোন নির্বাচন হবে—এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, সার্বিক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পরই নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো সম্ভব হবে। কমিশন বর্তমানে মাঠ প্রশাসন, আইনগত প্রস্তুতি এবং মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিশন সব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কোন নির্বাচন আগে হবে আর কোনটি পরে হবে, তা নির্ধারণে বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে কিছু আইনি সংস্কার প্রয়োজন। বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে সংস্কার জরুরি।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচন আয়োজনের আগে কিছু আইন-কানুন পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি বিধি ও নীতিমালাতেও সংশোধন প্রয়োজন রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে তিনি ধারণা দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনায় জাতীয় বাজেট এবং বর্ষা মৌসুমও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রয়েছে। জুন মাসে জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের পর নির্বাচনসংক্রান্ত অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক ব্যয় নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া বর্ষাকালে দেশের অনেক এলাকায় ভোটগ্রহণে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলেও কমিশন বিবেচনা করছে।
মাঠ প্রশাসনের প্রস্তুতিকেও কমিশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্বাচন পরিচালনায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ইসি। এজন্য আগেভাগেই প্রশাসনিক সমন্বয় ও সক্ষমতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও জাতীয় নির্বাচনের মতো গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় নির্বাচনে যে মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনেও সেই মান বজায় রাখার চেষ্টা থাকবে। জনগণের আস্থা ধরে রাখাই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “জাতীয় নির্বাচন যে স্ট্যান্ডার্ডে হয়েছে, সেই স্ট্যান্ডার্ডের নিচে নামার কোনো সুযোগ নেই। আমরা চাই ভবিষ্যতেও ভালো নির্বাচন হোক এবং জনগণের আস্থা বজায় থাকুক।” কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার দলীয় প্রতীক না থাকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, এবার কোনো প্রতীক থাকবে না এবং রাজনৈতিক পরিচয়ও সামনে আসবে না। এতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারে বলে আশা করছে কমিশন।
তিনি আরও বলেন, দলীয় সরকার থাকলেও সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে বলে কমিশনের প্রত্যাশা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ভালো নির্বাচনের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে।
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে বলেও উল্লেখ করেন এই নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, দেশের অর্জিত সুনাম নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সেই আস্থা আরও শক্তিশালী করতে চায় নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরাই সরাসরি জনগণের সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে এসব নির্বাচন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা মনে করছেন, সময়মতো নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণও বাড়বে। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান উদ্যোগ সেই দিকেই ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের যে পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশন নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আইনগত প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে। কমিশন এখন সেই লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। জনগণও এখন অপেক্ষা করছে কবে আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করা হয়।





















