ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমেও। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে টাইগার শিবিরে এখন আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রাণবন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। ক্রিকেট মাঠে একসঙ্গে খেললেও ফুটবলের ক্ষেত্রে তারা দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
অনুশীলন মাঠ থেকে শুরু করে টিম বাস, হোটেলের ডাইনিং কিংবা ড্রেসিংরুম—সুযোগ পেলেই ফুটবল নিয়ে জমে ওঠে আলোচনা। কখনো তা বন্ধুত্বপূর্ণ খোঁচাখুঁচিতে রূপ নেয়, আবার কখনো তর্ক গড়ায় নিজেদের পছন্দের দলকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের চেষ্টায়। বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই উত্তেজনাও যেন বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ দলের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের তালিকায় রয়েছেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস, টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। তাদের বিশ্বাস, বিশ্ব ফুটবলের শিল্প, সৌন্দর্য ও সৃজনশীলতা এখনো সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে লিওনেল মেসির খেলায়।
অন্যদিকে ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ব্রাজিলের একনিষ্ঠ সমর্থক। দলের অন্য দুই অধিনায়ক আর্জেন্টিনার সমর্থক হওয়ায় তাকে মজা করে একা বলে খোঁচা দেওয়া হলেও তিনি তা সহজভাবে নেননি। বরং রসিকতার সুরে জানিয়েছেন, তার সঙ্গে আছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালও।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ও সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের ব্রাজিলপ্রেম অনেক দিনের। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই ব্রাজিলের প্রতি তার সমর্থনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এবারও তিনি সেলেসাওদের সফলতা দেখতে মুখিয়ে আছেন।
মিরাজের পাশাপাশি জাতীয় দলের পেসার তাসকিন আহমেদ, ব্যাটার তাওহিদ হৃদয়, অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন এবং পেসার মোস্তাফিজুর রহমানও ব্রাজিলের সমর্থক। ফলে ব্রাজিল শিবির সংখ্যায় কম হলেও তাদের আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই।
তবে সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস কিছুটা বেশি বলেই মনে হয়। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি, মেসির নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের উদাহরণ টেনে তারা প্রায়ই ব্রাজিল সমর্থকদের চাপে ফেলে দেন।
তরুণ লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনও আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে পরিচিত। দলের অন্যান্য আর্জেন্টিনা ভক্তদের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, বর্তমান সময়ের ফুটবলে আর্জেন্টিনা অন্যতম শক্তিশালী দল এবং শিরোপার দাবিদার।
দলের ভেতরে সবচেয়ে মজার পরিস্থিতি দেখা যায় লিটন দাসের পরিবারে। তিনি নিজে আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও তার স্ত্রী ব্রাজিলের ভক্ত। ফলে বিশ্বকাপ এলেই পরিবারে শুরু হয় বন্ধুত্বপূর্ণ ঠান্ডা যুদ্ধ।
মজা করে লিটন জানিয়েছেন, তাদের মেয়েকে কোন দলের সমর্থক বানানো হবে, তা নিয়েও মাঝেমধ্যে আলোচনা ও হাস্যরস চলে। পারিবারিক এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বকাপের সময় আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
লিটনের মতে, আর্জেন্টিনার সামনে আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, মেসির নেতৃত্বে দলটি আবারও বড় সাফল্য অর্জন করতে পারে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন খুব বেশি দূরে নয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের আধিপত্য অবশ্য নতুন কিছু নয়। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রজন্ম ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এর সদস্যদের মধ্যেও আর্জেন্টিনা সমর্থকের সংখ্যা বেশি।
পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে একমাত্র তামিম ইকবাল ব্রাজিলের সমর্থক। অন্যদিকে মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
বিশেষ করে মাশরাফি দিয়েগো ম্যারাডোনার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা বহুবার প্রকাশ করেছেন। ফুটবল কিংবদন্তির প্রতি তার আবেগ অনেক সমর্থকের কাছেই সুপরিচিত।
মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিম আবার লিওনেল মেসির ভক্ত হিসেবে পরিচিত। আর্জেন্টাইন অধিনায়কের খেলার ধরন, নেতৃত্ব এবং সাফল্য তাদের মুগ্ধ করেছে দীর্ঘদিন ধরে।
সাকিব আল হাসানকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমের আলাদা গল্প রয়েছে। অনেকের ধারণা, ক্রিকেটার না হলে হয়তো তিনি একজন পেশাদার ফুটবলারই হতেন। ফুটবলের প্রতি নিজের আগ্রহের কথা তিনি বিভিন্ন সময় প্রকাশও করেছেন।
ক্রিকেট মাঠে সাকিবের পায়ের কাজ এবং বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা দেখেও অনেকেই তার ফুটবল প্রতিভার প্রশংসা করেন। বিশ্বকাপ চলাকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও সমর্থন থাকবে আর্জেন্টিনার পক্ষেই।
তবে জাতীয় দলে ব্যতিক্রমও রয়েছে। তরুণ পেসার নাহিদ রানা পর্তুগালের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ভক্ত। যদিও তিনি কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় দলের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান না।
বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে এখন আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করছে। অনুশীলনের ফাঁকে স্লেজিং, ভবিষ্যদ্বাণী, ঠাট্টা-তামাশা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ বিতর্কে সময় কাটছে ক্রিকেটারদের।
ব্যস্ত সূচি, ম্যাচের চাপ এবং পেশাদার দায়িত্বের মাঝেও ফুটবল বিশ্বকাপ যেন টাইগারদের জন্য বাড়তি আনন্দের উৎস হয়ে উঠেছে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বৈরথের এই উন্মাদনা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন দলের সদস্যরা।


























