মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে। এই ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে এবং সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
সোমবার ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ফল দিতে শুরু করেছে।
মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেভায় স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী শুক্রবার থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য স্বস্তির বার্তা নয়। বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মহলে তেহরানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা।
কিন্তু নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোয় নেতানিয়াহুর সেই অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রভাবকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষ করে এমন সময়ে এই ঘটনা ঘটছে যখন ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন সামনে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু করেছে।
ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়ানো এবং অন্যটি হলো ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থে ছাড় দেওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুটি পথই নেতানিয়াহুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র এবং সেই সম্পর্কের অবনতি হলে তা নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প সম্প্রতি নেতানিয়াহুর কিছু সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বৈরুতে হামলার নির্দেশ নিয়ে তার মন্তব্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই মন্তব্যকে হাতিয়ার বানিয়ে বিরোধীরা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করছে। তাদের দাবি, বর্তমান সরকারের নীতির কারণে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগের তুলনায় বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
নেতানিয়াহুর নিজ দল লিকুদ এবং তার জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির প্রকাশ্যে বলেছেন, ট্রাম্পের চুক্তি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তার মতে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এমন কোনো সমঝোতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এদিকে ইরান দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে হবে। এই দাবি ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অনেক ইসরায়েলি বিশ্লেষক মনে করছেন, এর ফলে হেজবুল্লাহ আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে যেতে পারে। একই সঙ্গে লেবাননের রাজনীতিতেও সংগঠনটির প্রভাব বজায় থাকার সুযোগ তৈরি হবে।
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ও ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কেন এমন শর্তে রাজি হলো তা বোঝা কঠিন। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত হেজবুল্লাহর জন্য পরোক্ষ সুবিধা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর নীরবতাও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত বড় কোনো নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক ইস্যুতে সরব থাকলেও এবার তিনি তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন বাস্তবতায় তিনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন তা নিয়ে এখনো কৌশল নির্ধারণ করছেন। কারণ সরাসরি বিরোধিতা করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে।
গাজা যুদ্ধের পর নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল আক্রমণাত্মক নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করা। তার লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক হুমকিগুলোকে দ্রুত এবং শক্ত হাতে মোকাবিলা করা।
তবে দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পরও হামাস পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটি এখনো গাজার উল্লেখযোগ্য অংশে সক্রিয় রয়েছে এবং নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
একই সঙ্গে লেবানন ও সিরিয়ায় চলমান সামরিক উপস্থিতিও ইসরায়েলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে দেশটির সামরিক সম্পদ এবং রিজার্ভ বাহিনীর ওপরও চাপ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে বর্তমান পরিস্থিতি তেহরানকে নতুন কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে তাদের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক বিশ্লেষক এখন তেহরান নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও সংযত এবং কার্যকর কৌশল প্রয়োজন।
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতা ইসরায়েলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তিনি মনে করেন, পুরোনো কৌশল দিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
তার মতে, ওয়াশিংটন যদি মনে করে কোনো পক্ষ এই চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ফলে ইসরায়েলের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মূল্য হয়তো দিতে হতে পারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে।























