ঢাকা ০১:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo চায়ের চিনি বাদ দিয়ে গুড়-মধু খাচ্ছেন? জানুন আসল সত্য Logo বর্ষায় ত্বকের যত্নে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন Logo পারমাণবিক জাহাজে উত্তর মেরু ঘুরল রাজশাহীর প্রত্যয় Logo রায়গঞ্জে ব্যতিক্রমী ফুটবল আয়োজনে উন্মাদনায় মাতলেন যুবসমাজ Logo বিশ্বের শীর্ষ বন্দর তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৮তম Logo মন ও শরীরের যত্নে প্রতিদিন ২০ মিনিট সময় দিন প্রকৃতিকে Logo কচু খেলে গলা ধরে কেন জানুন পুষ্টিগুণ ও সতর্কতার কারণ Logo অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে দিচ্ছেন রূপচর্চায় কাজে লাগা এই উপাদানগুলো Logo দামি স্কিনকেয়ার ছাড়াই সুন্দর ত্বক আর ঝলমলে চুলের সহজ উপায় Logo ভূরুঙ্গামারীতে এনসিপির ৩ মাসের আংশিক কমিটিতে আহ্বায়ক মাহফুজুল ইসলাম কিরণ , সদস্য সচিব মোর্শেদুর রহমান আনিস

রোনালদোর গোল, পর্তুগালের

রোনালদোর গোল করে পর্তুগালের লিড নেওয়ার মুহূর্ত । ছবি: সংগৃহীত

রোনালদোর গোল—এই দুটি শব্দই আবারও ফুটবল বিশ্বকে আলোচনায় এনে দিয়েছে। সমালোচনা, প্রশ্ন আর বয়স নিয়ে নানা বিতর্কের মধ্যেই ২০২৬ বিশ্বকাপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে গোল করে পর্তুগালকে এগিয়ে দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। শুধু দলকে লিডই এনে দেননি, নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন আরেকটি অনন্য বিশ্বরেকর্ডও। ম্যাচের শুরুতেই গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা; প্রতিভা, অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তাই একজন কিংবদন্তিকে আলাদা করে তোলে।

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে পর্তুগাল। আর ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটেই জোয়াও ক্যানসেলোর দারুণ ক্রস থেকে বল জালে জড়িয়ে দেন রোনালদো। সেই গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। পরে নুনো মেন্দেস আরেকটি গোল করে ব্যবধান বাড়ান।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি রোনালদো। পর্তুগালও ১-১ গোলে ড্র করে হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ে। সেই ম্যাচের পর অনেক ফুটবল বিশ্লেষক এবং সাবেক খেলোয়াড় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ৪১ বছর বয়সী এই তারকাকে মূল একাদশে রাখা কতটা যৌক্তিক।

কেউ কেউ তো সরাসরি বলেছিলেন, এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু রোনালদো বরাবরই সমালোচনার উত্তর দিয়ে এসেছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক সেটাই করলেন তিনি।

ম্যাচের শুরু থেকেই তাকে দেখা যায় আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত। প্রতিটি আক্রমণে সক্রিয় অংশগ্রহণ, সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং গোলের জন্য ক্ষুধা—সবকিছুই ছিল চোখে পড়ার মতো। আর সুযোগ পেয়েই তিনি দেখিয়ে দিলেন কেন এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলদাতা হিসেবে বিবেচিত হন।

ম্যাচের মাত্র ছয় মিনিট পার হয়েছে। ডান দিক দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যান জোয়াও ক্যানসেলো। তিনি নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দেন বক্সের ভেতরে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন রোনালদো। অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড কোনো ভুল না করে এক টাচেই বল জড়িয়ে দেন জালে।

গোলের পর স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শক উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। রোনালদোও তার বিখ্যাত ‘সিউ’ উদযাপনের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেন। অনেকের মতে, এই উদযাপনের মধ্যে ছিল স্বস্তি, আত্মবিশ্বাস এবং সমালোচকদের উদ্দেশে এক নীরব বার্তা।

এই গোলের মাধ্যমে রোনালদো ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তিনি বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—প্রতিটি বিশ্বকাপেই গোল করেছেন তিনি।

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন অর্জন আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। যদিও আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসিও ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন, তবে সব আসরে গোল করতে পারেননি। ফলে এই রেকর্ডে এককভাবে শীর্ষে উঠে গেলেন রোনালদো।

৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে গোল করা সহজ কোনো বিষয় নয়। অধিকাংশ ফুটবলার এই বয়সে অবসর নিয়ে ফেলেন। কিন্তু রোনালদো এখনও জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

তার ফিটনেস, পেশাদারিত্ব এবং কঠোর পরিশ্রমের গল্প ফুটবল দুনিয়ায় কিংবদন্তি হয়ে গেছে। প্রতিদিনের অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক যত্নের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন পর্যায়ে ধরে রেখেছেন, যা তরুণ খেলোয়াড়দের জন্যও অনুকরণীয়।

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোলটি প্রমাণ করেছে যে তিনি এখনও বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম।

কঙ্গোর বিপক্ষে ড্র করার পর এই ম্যাচটি পর্তুগালের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপ পর্ব থেকে পরবর্তী রাউন্ডে যেতে হলে জয় প্রয়োজন ছিল।

কোচ রবার্তো মার্টিনেজ তাই দলে কিছু পরিবর্তন আনেন। রুবেন দিয়াসকে ফিরিয়ে আনা হয়, আর আক্রমণভাগে রাখা হয় জোয়াও ফেলিক্সকে। সেই পরিবর্তনের সুফলও পাওয়া যায় দ্রুত।

রোনালদোর গোল দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। এরপর আরও সংগঠিত ফুটবল খেলতে থাকে পর্তুগাল। প্রতিটি বিভাগে তারা আধিপত্য বিস্তার করে।

রোনালদোর গোলের পরও আক্রমণ থামায়নি পর্তুগাল। ম্যাচের ১৭তম মিনিটে নুনো মেন্দেস একটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন।

এই গোলের ফলে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০। উজবেকিস্তানের রক্ষণভাগ তখন পুরোপুরি চাপে পড়ে যায়। পর্তুগালও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণে উজবেকিস্তান বেশ সাহসী ফুটবল উপহার দিয়েছে। তবে পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তারা শুরু থেকেই চাপে ছিল।

রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিটিনহা এবং জোয়াও ফেলিক্সদের গতিময় আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় উজবেক রক্ষণকে।

গোল হজম করার পর তারা ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও পর্তুগালের নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের সামনে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।

ম্যাচ শুরুর আগ থেকেই স্টেডিয়ামে ছিল রোনালদো উন্মাদনা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা এসেছিলেন শুধুমাত্র তাকে একনজর দেখার জন্য।

অনেক সমর্থক পর্তুগালের জার্সি পরে উপস্থিত হন। আবার কেউ কেউ রোনালদোর নাম লেখা ব্যানার নিয়ে মাঠে আসেন।

গোল করার পর স্টেডিয়ামের পরিবেশ আরও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। দর্শকদের করতালি এবং উচ্ছ্বাস বুঝিয়ে দেয়, এখনও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় আকর্ষণ তিনি।

ফুটবল বিশ্বে রোনালদো এবং মেসির তুলনা বহু বছরের। দুজনই নিজেদের প্রজন্মের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত।

মেসি যেখানে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন, সেখানে রোনালদোর ক্যারিয়ারে সেই ট্রফি এখনও অধরা। তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের ক্ষেত্রে তিনি নিয়মিতই নতুন নতুন ইতিহাস লিখে চলেছেন।

ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড সেই তালিকায় নতুন সংযোজন। ফলে আবারও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে দুই মহাতারকার অর্জন নিয়ে আলোচনা।

ম্যাচের আগে রবার্তো মার্টিনেজ রোনালদোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দলের ভেতরে ঐক্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রোনালদোকে নিয়ে বাইরে যত আলোচনা থাকুক, কোচ তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। মাঠে নেমে গোল করে সেই আস্থার প্রতিদান দিলেন পর্তুগালের অধিনায়ক।

গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে রোনালদোর উদযাপন ছিল বেশ আবেগঘন। অনেকে মনে করছেন, এটি দলের ঐক্যেরই প্রতিফলন।

বিশেষ করে জোয়াও ক্যানসেলোর সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। গোলের পেছনে ক্যানসেলোর অবদানও কম ছিল না।

পর্তুগিজ মিডিয়া ম্যাচের পর তাদের জুটিকে দলের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় পর্তুগালের জন্য নকআউট পর্বের পথে বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

গ্রুপের বাকি ম্যাচগুলোতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। তাই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা জরুরি।

রোনালদোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপের শেষ আসরে তিনি দলকে কতদূর নিয়ে যেতে পারেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

রোনালদোর গোল শুধু পর্তুগালকে লিড এনে দেয়নি, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখেছে। ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়।

সমালোচনার মুখে পড়ে যিনি মাথা নত করেন না, বরং মাঠে নেমে জবাব দেন—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেই বিরল ক্রীড়াবিদদের একজন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে তার গোলটি হয়তো শুধু একটি ম্যাচের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে না; এটি স্মরণ করিয়ে দেবে যে কিংবদন্তিরা কখনও সহজে হারিয়ে যান না।

জনপ্রিয় সংবাদ

চায়ের চিনি বাদ দিয়ে গুড়-মধু খাচ্ছেন? জানুন আসল সত্য

রোনালদোর গোল, পর্তুগালের

Update Time : ১১:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

রোনালদোর গোল—এই দুটি শব্দই আবারও ফুটবল বিশ্বকে আলোচনায় এনে দিয়েছে। সমালোচনা, প্রশ্ন আর বয়স নিয়ে নানা বিতর্কের মধ্যেই ২০২৬ বিশ্বকাপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে গোল করে পর্তুগালকে এগিয়ে দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। শুধু দলকে লিডই এনে দেননি, নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন আরেকটি অনন্য বিশ্বরেকর্ডও। ম্যাচের শুরুতেই গোল করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা; প্রতিভা, অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তাই একজন কিংবদন্তিকে আলাদা করে তোলে।

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে পর্তুগাল। আর ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটেই জোয়াও ক্যানসেলোর দারুণ ক্রস থেকে বল জালে জড়িয়ে দেন রোনালদো। সেই গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। পরে নুনো মেন্দেস আরেকটি গোল করে ব্যবধান বাড়ান।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিপক্ষে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেননি রোনালদো। পর্তুগালও ১-১ গোলে ড্র করে হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ে। সেই ম্যাচের পর অনেক ফুটবল বিশ্লেষক এবং সাবেক খেলোয়াড় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ৪১ বছর বয়সী এই তারকাকে মূল একাদশে রাখা কতটা যৌক্তিক।

কেউ কেউ তো সরাসরি বলেছিলেন, এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু রোনালদো বরাবরই সমালোচনার উত্তর দিয়ে এসেছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ঠিক সেটাই করলেন তিনি।

ম্যাচের শুরু থেকেই তাকে দেখা যায় আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত। প্রতিটি আক্রমণে সক্রিয় অংশগ্রহণ, সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং গোলের জন্য ক্ষুধা—সবকিছুই ছিল চোখে পড়ার মতো। আর সুযোগ পেয়েই তিনি দেখিয়ে দিলেন কেন এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলদাতা হিসেবে বিবেচিত হন।

ম্যাচের মাত্র ছয় মিনিট পার হয়েছে। ডান দিক দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যান জোয়াও ক্যানসেলো। তিনি নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দেন বক্সের ভেতরে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন রোনালদো। অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড কোনো ভুল না করে এক টাচেই বল জড়িয়ে দেন জালে।

আরও পড়ুন  কলম্বিয়ার নির্বাচনে জয়ের পথে ট্রাম্প সমর্থিত প্রার্থী

গোলের পর স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শক উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। রোনালদোও তার বিখ্যাত ‘সিউ’ উদযাপনের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেন। অনেকের মতে, এই উদযাপনের মধ্যে ছিল স্বস্তি, আত্মবিশ্বাস এবং সমালোচকদের উদ্দেশে এক নীরব বার্তা।

এই গোলের মাধ্যমে রোনালদো ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তিনি বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—প্রতিটি বিশ্বকাপেই গোল করেছেন তিনি।

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন অর্জন আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। যদিও আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসিও ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন, তবে সব আসরে গোল করতে পারেননি। ফলে এই রেকর্ডে এককভাবে শীর্ষে উঠে গেলেন রোনালদো।

৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপে গোল করা সহজ কোনো বিষয় নয়। অধিকাংশ ফুটবলার এই বয়সে অবসর নিয়ে ফেলেন। কিন্তু রোনালদো এখনও জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

তার ফিটনেস, পেশাদারিত্ব এবং কঠোর পরিশ্রমের গল্প ফুটবল দুনিয়ায় কিংবদন্তি হয়ে গেছে। প্রতিদিনের অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক যত্নের মাধ্যমে তিনি নিজেকে এমন পর্যায়ে ধরে রেখেছেন, যা তরুণ খেলোয়াড়দের জন্যও অনুকরণীয়।

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোলটি প্রমাণ করেছে যে তিনি এখনও বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম।

কঙ্গোর বিপক্ষে ড্র করার পর এই ম্যাচটি পর্তুগালের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রুপ পর্ব থেকে পরবর্তী রাউন্ডে যেতে হলে জয় প্রয়োজন ছিল।

কোচ রবার্তো মার্টিনেজ তাই দলে কিছু পরিবর্তন আনেন। রুবেন দিয়াসকে ফিরিয়ে আনা হয়, আর আক্রমণভাগে রাখা হয় জোয়াও ফেলিক্সকে। সেই পরিবর্তনের সুফলও পাওয়া যায় দ্রুত।

আরও পড়ুন  বিশ্বকাপের সেরা ১০ তারকা প্রকাশ, শীর্ষে মেসি

রোনালদোর গোল দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। এরপর আরও সংগঠিত ফুটবল খেলতে থাকে পর্তুগাল। প্রতিটি বিভাগে তারা আধিপত্য বিস্তার করে।

রোনালদোর গোলের পরও আক্রমণ থামায়নি পর্তুগাল। ম্যাচের ১৭তম মিনিটে নুনো মেন্দেস একটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন।

এই গোলের ফলে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০। উজবেকিস্তানের রক্ষণভাগ তখন পুরোপুরি চাপে পড়ে যায়। পর্তুগালও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণে উজবেকিস্তান বেশ সাহসী ফুটবল উপহার দিয়েছে। তবে পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তারা শুরু থেকেই চাপে ছিল।

রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিটিনহা এবং জোয়াও ফেলিক্সদের গতিময় আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় উজবেক রক্ষণকে।

গোল হজম করার পর তারা ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও পর্তুগালের নিয়ন্ত্রিত ফুটবলের সামনে খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।

ম্যাচ শুরুর আগ থেকেই স্টেডিয়ামে ছিল রোনালদো উন্মাদনা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা এসেছিলেন শুধুমাত্র তাকে একনজর দেখার জন্য।

অনেক সমর্থক পর্তুগালের জার্সি পরে উপস্থিত হন। আবার কেউ কেউ রোনালদোর নাম লেখা ব্যানার নিয়ে মাঠে আসেন।

গোল করার পর স্টেডিয়ামের পরিবেশ আরও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। দর্শকদের করতালি এবং উচ্ছ্বাস বুঝিয়ে দেয়, এখনও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় আকর্ষণ তিনি।

ফুটবল বিশ্বে রোনালদো এবং মেসির তুলনা বহু বছরের। দুজনই নিজেদের প্রজন্মের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত।

মেসি যেখানে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন, সেখানে রোনালদোর ক্যারিয়ারে সেই ট্রফি এখনও অধরা। তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের ক্ষেত্রে তিনি নিয়মিতই নতুন নতুন ইতিহাস লিখে চলেছেন।

ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড সেই তালিকায় নতুন সংযোজন। ফলে আবারও ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে দুই মহাতারকার অর্জন নিয়ে আলোচনা।

আরও পড়ুন  বিশ্বকাপের আগেই আয়োজক দেশের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ জানাল ইরান শিবির

ম্যাচের আগে রবার্তো মার্টিনেজ রোনালদোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দলের ভেতরে ঐক্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রোনালদোকে নিয়ে বাইরে যত আলোচনা থাকুক, কোচ তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। মাঠে নেমে গোল করে সেই আস্থার প্রতিদান দিলেন পর্তুগালের অধিনায়ক।

গোলের পর সতীর্থদের সঙ্গে রোনালদোর উদযাপন ছিল বেশ আবেগঘন। অনেকে মনে করছেন, এটি দলের ঐক্যেরই প্রতিফলন।

বিশেষ করে জোয়াও ক্যানসেলোর সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। গোলের পেছনে ক্যানসেলোর অবদানও কম ছিল না।

পর্তুগিজ মিডিয়া ম্যাচের পর তাদের জুটিকে দলের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয় পর্তুগালের জন্য নকআউট পর্বের পথে বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

গ্রুপের বাকি ম্যাচগুলোতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। তাই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা জরুরি।

রোনালদোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বকাপের শেষ আসরে তিনি দলকে কতদূর নিয়ে যেতে পারেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

রোনালদোর গোল শুধু পর্তুগালকে লিড এনে দেয়নি, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখেছে। ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়।

সমালোচনার মুখে পড়ে যিনি মাথা নত করেন না, বরং মাঠে নেমে জবাব দেন—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেই বিরল ক্রীড়াবিদদের একজন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে তার গোলটি হয়তো শুধু একটি ম্যাচের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে না; এটি স্মরণ করিয়ে দেবে যে কিংবদন্তিরা কখনও সহজে হারিয়ে যান না।