কাতার বিশ্বকাপের তিক্ত স্মৃতি পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রথম প্রতিপক্ষ শক্তিশালী মরক্কো, যারা গত বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ম্যাচটি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে নাটকীয়ভাবে বিদায় নেওয়ার ক্ষত এখনও ভুলতে পারেনি ব্রাজিল। অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে তারা ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৪-২ ব্যবধানে পরাজয় মেনে নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল সেলেসাওদের।
সেই হতাশার পর চার বছর কেটে গেছে। এবার নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছে ব্রাজিল। দীর্ঘ ২৪ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দেশ তারা। সর্বোচ্চ ১১৪ ম্যাচ খেলা, ৭৪ জয় এবং পাঁচটি শিরোপা তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তবে পরিসংখ্যান যতই সমৃদ্ধ হোক, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি ব্রাজিল। ২০০২ সালের পর আর ট্রফির দেখা না পাওয়া দলটি এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে মরিয়া। ফুটবলপ্রেমীদেরও প্রত্যাশা, আমেরিকার মাটিতেই আবারও সাফল্যের দেখা পাবে সেলেসাওরা।
বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পথটাও খুব সহজ ছিল না ব্রাজিলের জন্য। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ১৮ ম্যাচে ৮ জয়, ৪ ড্র ও ৬ হারে পয়েন্ট তালিকার পঞ্চম স্থানে থেকে সরাসরি টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র। বলিভিয়ার কাছে হার এবং জাপান ও ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে পরাজয় নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল দলটিকে ঘিরে। তবে শেষ তিন ম্যাচে ক্রোয়েশিয়া, পানামা ও মিশরকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে আনচেলত্তির শিষ্যরা।
এই তিন ম্যাচে ব্রাজিল মোট ১১টি গোল করেছে এবং হজম করেছে মাত্র চারটি। আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া ও লুকাস পাকেতাদের পারফরম্যান্স কোচকে আশাবাদী করে তুলেছে। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুসের গতি এবং সৃজনশীলতা দলের বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে মরক্কোও এই বিশ্বকাপে এসেছে বড় স্বপ্ন নিয়ে। ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দিয়েছিল তারা। সেই সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের সপ্তম অংশগ্রহণে আরও বড় কিছু অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামছে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী এই দল। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে বিশ্বের সেরা দলগুলোর কাতারে নিয়ে গেছে।
২০২৩ সালের শুরু থেকে খেলা ৪৫ ম্যাচের মধ্যে ৩৩টিতে জয় পেয়েছে মরক্কো। ১০টি ম্যাচ ড্র করেছে এবং মাত্র দুটি ম্যাচে পরাজিত হয়েছে। এই অসাধারণ ধারাবাহিকতা তাদের বর্তমান শক্তিমত্তার প্রমাণ বহন করে।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও মরক্কোর অবস্থান এখন বেশ উঁচুতে। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং জার্মানির মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর চেয়েও উপরে অবস্থান করছে আফ্রিকান প্রতিনিধিরা। ফলে ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটি মোটেও সহজ হবে না।
তবে দল নির্বাচনে কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি দুই দলই। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম নেইমার। ইনজুরি কাটিয়ে উঠলেও তিনি এখনও পুরোপুরি ফিট নন। ফলে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়া রাইট-ব্যাক ওয়েসলিও চোটের কারণে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেছেন। ফলে রক্ষণভাগ সাজাতে কিছুটা নতুন পরিকল্পনা করতে হচ্ছে আনচেলত্তিকে। দানিলো, রজার ইবানেজ এবং এদারসনের মধ্যে থেকে বিকল্প বেছে নিতে হবে তাকে।
ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশে গোলপোস্টে থাকবেন অ্যালিসন বেকার। রক্ষণে মারকুইনোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের সঙ্গে দেখা যেতে পারে দানিলো ও আলেক্স সান্দ্রোকে। মাঝমাঠে কাসেমিরো ও ব্রুনো গুইমারেসের উপস্থিতি দলকে ভারসাম্য দেবে।
আক্রমণভাগে রাফিনিয়া, পাকেতা ও ভিনিসিয়ুসের পাশাপাশি স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে পারেন মাথিউস কুনহা। তবে এন্দ্রিক কিংবা ইগর থিয়াগোকেও শেষ মুহূর্তে সুযোগ দিতে পারেন আনচেলত্তি।
মরক্কোও ইনজুরি সমস্যায় ভুগছে। ডিফেন্ডার নায়েফ আগুয়ের্দ এবং উইঙ্গার আবদে এজাজুলি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন। তাদের অনুপস্থিতি দলের পরিকল্পনায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া নউসাইর মাজরাউইয়ের খেলা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রস্তুতি ম্যাচে কাঁধে চোট পাওয়ার পর তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি এবং ব্রাহিম দিয়াজের মতো তারকারা দলের বড় ভরসা হয়ে থাকবেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা এবং মরক্কোর সাম্প্রতিক ফর্ম—দুইয়ের সংঘাতই এই ম্যাচকে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ব্রাজিল চাইবে জয়ের মাধ্যমে ট্রফি মিশনের শক্ত ভিত্তি গড়তে, আর মরক্কো চাইবে আবারও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে।
সব মিলিয়ে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দর্শকরা একটি হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের অপেক্ষায় আছেন। বিশ্বকাপের শুরুতেই দুই শক্তিশালী দলের এই মুখোমুখি লড়াই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ম্যাচ হয়ে উঠতে পারে। ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের প্রথম ধাপ কতটা সফল হবে, তার উত্তর মিলবে রোববার ভোরের এই মহারণে।

























