শিক্ষক কর্মচারী অর্থ নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে বড় সুখবর এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ এবার তাদের প্রাপ্য অর্থ পেতে যাচ্ছেন। সরকারের বিশেষ উদ্যোগে আগামী ১৫ আগস্ট থেকে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের আওতাভুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ উপকৃত হবেন। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই উদ্যোগকে অনেকেই স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে অবসরের পর চিকিৎসা, সংসার কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে যারা সমস্যায় পড়েছিলেন, তাদের জন্য এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে।
সরকারি উদ্যোগ অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে মোট ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের আওতায় প্রায় ৭০ হাজার এবং কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় প্রায় ৪৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অর্থ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এই বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আসছেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ আগস্টের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর ১৫ আগস্ট থেকে বিতরণ শুরু হওয়ার কথা। শিক্ষক কর্মচারী অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর পরিকল্পনা থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি আগের তুলনায় আরও সহজ ও স্বচ্ছ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এবার অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে ‘আইবাস++’ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানো সম্ভব হবে এবং মাঝখানে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে। অবসর সুবিধা বোর্ডের হিসাবে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের অনেক আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রায় ৭০ হাজারের বেশি আবেদন পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তির পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালে মূল বেতনের ৬ শতাংশ হারে জমা হওয়া অর্থের ভিত্তিতে একজন সর্বোচ্চ প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন। ফলে শিক্ষক কর্মচারী অর্থ পাওয়ার বিষয়টি অবসরপ্রাপ্ত অনেক পরিবারের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায়ও বড় পরিসরে অর্থ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত জমা হওয়া প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন নিয়ে কাজ চলছে। কল্যাণ সুবিধার জন্য চাকরির সময় মূল বেতনের ৪ শতাংশ হারে যে অর্থ জমা হয়, তার ভিত্তিতে একজন উপকারভোগী সর্বোচ্চ প্রায় আড়াই লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন প্রায় ৫০ হাজার টাকা পেতে পারেন। তবে এই অর্থ পরিশোধের জন্য শুধু বর্তমান বিশেষ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সব আবেদন নিষ্পত্তি করতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। তাই শিক্ষক কর্মচারী অর্থ বিতরণের এই উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হলেও পুরো সমস্যার সমাধানে আরও অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজেদের বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ জমা হয়। অবসর সুবিধার জন্য ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ হারে অর্থ কেটে রাখা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়া হয়, যার একটি অংশ অবসর ও কল্যাণ তহবিলে জমা হয়। কিন্তু প্রতি মাসে নতুন করে যে পরিমাণ আবেদন জমা পড়ে, তার তুলনায় তহবিলে অর্থের প্রবাহ কম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আবেদন জমে গেছে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক-কর্মচারী নিজেদের জমা অর্থ পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন। বর্তমান উদ্যোগ সেই জটিলতা কমানোর ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দে সব আবেদন নিষ্পত্তি হবে না—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট মিলিয়ে জমে থাকা সব আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য প্রায় ৯ হাজার কোটি এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৩ হাজার কোটির বেশি অর্থ দরকার। তাই এবারের শিক্ষক কর্মচারী অর্থ বিতরণ অনেকের অপেক্ষার অবসান ঘটালেও বাকি আবেদনকারীদের জন্য ভবিষ্যতে আরও অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন হবে। এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল প্রত্যাশা—প্রক্রিয়াটি যেন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সম্পন্ন হয়।
























