ঢাকা ১০:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

একাকিত্ব কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? জানুন গবেষণার তথ্য

একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগা মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে একা থাকা শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের নয়, হৃদযন্ত্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব রক্তচাপ, প্রদাহ এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

একাকিত্ব ও হৃদস্বাস্থ্যের মধ্যে কী সম্পর্ক?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই শারীরিক অসুস্থতা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা কিংবা পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে থাকার কারণে একাকিত্বে ভোগেন। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে শরীর ও মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

২০২৫ সালে Social Science & Medicine জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় একাকিত্ব এবং করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে, একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এক নয়, তবে দুটি অবস্থাই হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের একাকিত্ব নিজেই করোনারি ধমনিতে ব্লকেজ তৈরির একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কেন একা থাকা হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন একা থাকলে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি হয়। এতে শরীর সবসময় সতর্ক বা ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ অবস্থায় থাকার মতো প্রতিক্রিয়া দেখায়।

এর ফলে—

  • রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
  • শরীরে প্রদাহের মাত্রা বাড়ে।
  • রক্তনালীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
  • হৃদযন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
  • দীর্ঘমেয়াদে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

গবেষণায় যা জানা গেছে

Scientific Reports-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

  • ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৩৩ শতাংশেরও বেশি একাকিত্বে ভোগেন।
  • ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি চারজনের একজন সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জীবন কাটান।
  • বিভিন্ন গবেষণার মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাই হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়াম নয়, সামাজিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একাকিত্বের লক্ষণ কী?

অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্বে ভুগছেন। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

  • সবসময় একা থাকতে ইচ্ছা করা।
  • পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া।
  • নিজের যত্ন না নেওয়া।
  • এলোমেলো জীবনযাপন ও অনিয়মিত খাবার খাওয়া।
  • আগের পছন্দের কাজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
  • অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা।
  • মনোযোগ কমে যাওয়া।
  • স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়া।
  • সবসময় শূন্যতা বা নিঃসঙ্গতা অনুভব করা।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

একাকিত্ব যে কারও হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

  • বয়স্ক ব্যক্তি।
  • একা বসবাসকারী মানুষ।
  • দীর্ঘদিন অসুস্থ ব্যক্তি।
  • অবসরপ্রাপ্ত মানুষ।
  • পরিবার থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি।
  • যাদের সামাজিক যোগাযোগ সীমিত।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্ব দূর করতে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

  • নিয়মিত পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
  • প্রতিবেশী বা পরিচিতদের সঙ্গে সময় কাটান।
  • প্রতিদিন কিছুটা হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করুন।
  • সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে অংশ নিন।
  • নিজের পছন্দের শখ বা সৃজনশীল কাজে সময় দিন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।
  • দীর্ঘদিন মন খারাপ বা একাকিত্ব থাকলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

হৃদরোগ প্রতিরোধে শুধু কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়। মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক সংযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের বা পরিবারের কোনো বয়স্ক সদস্য যদি দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভুগে থাকেন, তবে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।

একাকিত্বকে শুধু মানসিক সমস্যা হিসেবে না দেখে, হৃদস্বাস্থ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, নিয়মিত সক্রিয় থাকা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

জনপ্রিয় সংবাদ

সতীর্থদের আনফলো করেছেন রোনালদো? ভাইরাল তথ্য ঘিরে তোলপাড়

একাকিত্ব কি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়? জানুন গবেষণার তথ্য

Update Time : ০৯:০৬:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘদিন একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগা মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে একা থাকা শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের নয়, হৃদযন্ত্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব রক্তচাপ, প্রদাহ এবং মানসিক চাপ বাড়িয়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

একাকিত্ব ও হৃদস্বাস্থ্যের মধ্যে কী সম্পর্ক?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই শারীরিক অসুস্থতা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা কিংবা পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে থাকার কারণে একাকিত্বে ভোগেন। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ধীরে ধীরে শরীর ও মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

২০২৫ সালে Social Science & Medicine জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় একাকিত্ব এবং করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে, একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এক নয়, তবে দুটি অবস্থাই হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের একাকিত্ব নিজেই করোনারি ধমনিতে ব্লকেজ তৈরির একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কেন একা থাকা হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন একা থাকলে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি হয়। এতে শরীর সবসময় সতর্ক বা ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ অবস্থায় থাকার মতো প্রতিক্রিয়া দেখায়।

এর ফলে—

  • রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
  • শরীরে প্রদাহের মাত্রা বাড়ে।
  • রক্তনালীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
  • হৃদযন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
  • দীর্ঘমেয়াদে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

গবেষণায় যা জানা গেছে

Scientific Reports-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

  • ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ৩৩ শতাংশেরও বেশি একাকিত্বে ভোগেন।
  • ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি চারজনের একজন সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জীবন কাটান।
  • বিভিন্ন গবেষণার মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাই হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়াম নয়, সামাজিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একাকিত্বের লক্ষণ কী?

অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তারা দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্বে ভুগছেন। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

  • সবসময় একা থাকতে ইচ্ছা করা।
  • পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া।
  • নিজের যত্ন না নেওয়া।
  • এলোমেলো জীবনযাপন ও অনিয়মিত খাবার খাওয়া।
  • আগের পছন্দের কাজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
  • অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা।
  • মনোযোগ কমে যাওয়া।
  • স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়া।
  • সবসময় শূন্যতা বা নিঃসঙ্গতা অনুভব করা।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

একাকিত্ব যে কারও হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

  • বয়স্ক ব্যক্তি।
  • একা বসবাসকারী মানুষ।
  • দীর্ঘদিন অসুস্থ ব্যক্তি।
  • অবসরপ্রাপ্ত মানুষ।
  • পরিবার থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি।
  • যাদের সামাজিক যোগাযোগ সীমিত।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্ব দূর করতে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

  • নিয়মিত পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
  • প্রতিবেশী বা পরিচিতদের সঙ্গে সময় কাটান।
  • প্রতিদিন কিছুটা হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করুন।
  • সামাজিক বা স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে অংশ নিন।
  • নিজের পছন্দের শখ বা সৃজনশীল কাজে সময় দিন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।
  • দীর্ঘদিন মন খারাপ বা একাকিত্ব থাকলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

হৃদরোগ প্রতিরোধে শুধু কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করাই যথেষ্ট নয়। মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক সংযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের বা পরিবারের কোনো বয়স্ক সদস্য যদি দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভুগে থাকেন, তবে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।

একাকিত্বকে শুধু মানসিক সমস্যা হিসেবে না দেখে, হৃদস্বাস্থ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, নিয়মিত সক্রিয় থাকা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।