রাশিয়ার হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর ইউক্রেনজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল শোধনাগার, সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র কারখানা এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ড্রোন হামলা জোরদার করেছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই অভিযানকে রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া আরও ভয়াবহ হামলা চালাতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন তিনি।
বুধবার দিবাগত রাতে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া একযোগে শতাধিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কিয়েভে ব্যাপক হামলা চালায়। প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে চলা এই হামলায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দে প্রকম্পিত হয় পুরো শহর। বহু বাসিন্দা রাত কাটান মেট্রো স্টেশন ও ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে।
ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েক ডজন মানুষ। আহতদের মধ্যে একটি শিশু, কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ নাগরিক রয়েছেন। একটি অ্যাম্বুলেন্স সাবস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রমও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। ঘটনাস্থলে দ্রুত উদ্ধারকর্মী, দমকল বাহিনী এবং চিকিৎসা দল মোতায়েন করা হয়।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেনকো বলেছেন, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কয়েকটি বহুতল আবাসিক ভবনে সরাসরি আঘাত হানে। এতে ভবনের বড় অংশ ধসে পড়ে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়েন। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কিয়েভের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় প্রায় ৩০টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ি এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পুরো এলাকা। বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন অভিযোগ করেছে, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো এবং আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে। তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল কিয়েভসহ দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, পোলতাভা, চেরকাসি ও চেরনিহিভ অঞ্চলের সামরিক স্থাপনা, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামো। তাদের দাবি, সব হামলাই নির্ভুল দূরপাল্লার অস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয়েছে।
এদিকে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিলহা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষের ওপর ধারাবাহিক হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন এবং এর বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের জন্য আরও আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহেরও আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের সীমান্তের ভেতরে ড্রোন হামলা এবং কৌশলগত স্থাপনায় আঘাতের জবাব হিসেবেই রাশিয়া হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ নতুন করে আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও ক্রমেই বাড়ছে এবং নতুন করে মানবিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


























