নতুন বাজেট দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যেমন করছাড়ের মাধ্যমে কিছু খাতে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের নতুন পথও খুঁজছে সরকার। ফলে এবারের বাজেটকে করনীতি ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন বাজেটের অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব হলো ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করা। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে নতুন হিসাব খুলতে আগেই কর শনাক্তকরণ নম্বর সংগ্রহ করতে হবে। তবে শিক্ষার্থী, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতাভোগী, ১০ টাকার হিসাব এবং কিছু বিশেষ সুবিধাভোগী গ্রাহকের জন্য ছাড় রাখা হতে পারে। সরকারের ধারণা, এই উদ্যোগ করদাতার সংখ্যা বাড়াতে সহায়ক হবে।
করদাতাদের জন্য ইতিবাচক খবরও রয়েছে। ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে। পাশাপাশি ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপের সীমাও বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে ছোট আমানতকারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে।
নতুন বাজেটে খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্যও নতুন নিয়ম আসতে পারে। পণ্য সরবরাহের সময় প্রতি এক হাজার টাকায় দুই টাকা হারে অগ্রিম কর কেটে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেবে। এতে লাখ লাখ খুচরা ব্যবসায়ী প্রথমবারের মতো কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানোর উদ্যোগ। চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভোক্তাদের ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।
নতুন বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহৃত প্রযুক্তিপণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে সংগীতশিল্পী, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারা কম খরচে আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
চিকিৎসা খাতেও স্বস্তির খবর রয়েছে। হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিং, চোখের লেন্স, ডায়ালাইসিস ফিল্টার এবং বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর কমানো বা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশীয় ওষুধ শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে।
স্বর্ণ ক্রেতাদের জন্যও সুখবর রয়েছে। সোনা ও স্বর্ণালংকারের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে সোনার গয়না কেনার খরচ আগের তুলনায় কমে আসতে পারে।
নতুন বাজেটে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক-কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানি, নিবন্ধন এবং চার্জিং স্টেশন স্থাপনে কর সুবিধা দেওয়া হলে দেশে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্যও বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সেবার ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর অব্যাহতি ও ভ্যাট সুবিধা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে।
সব মিলিয়ে নতুন বাজেট একদিকে করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, রোগী, ব্যবসায়ী এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও নিয়ে আসছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
























