বিশ্বকাপের আগে সময়ের সঙ্গে যেন এক ধরনের দৌড়ে নেমেছেন ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার নেইমার। ডান পায়ের কাফ ইনজুরি থেকে দ্রুত সেরে উঠতে তিনি ব্যবহার করছেন নাসার প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ট্রেডমিল। চিকিৎসক ও ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ব্রাজিল শিবিরও তার দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আসর সামনে রেখে নেইমারের চোট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে। দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খেলোয়াড়কে ছাড়া মাঠে নামার কথা ভাবতেই চাইছে না সেলেসাও ভক্তরা। তবে মেডিকেল টিমের সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখে আশাবাদী হওয়ার মতো কারণও তৈরি হয়েছে।
ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম গ্লোবো এসপোর্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেইমার বর্তমানে এমন একটি ট্রেডমিলে অনুশীলন করছেন যা শরীরের নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজন কমিয়ে দেয়। ফলে দৌড়ানোর সময় ইনজুরিগ্রস্ত পেশি ও জয়েন্টের ওপর চাপ অনেকাংশে কম পড়ে। এতে দ্রুত এবং নিরাপদভাবে পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়।
বিশেষ এই প্রযুক্তির মূল ধারণা এসেছে মহাকাশ গবেষণার বিভিন্ন প্রকল্প থেকে। মহাকাশচারীরা দীর্ঘ সময় মহাশূন্যে থাকার পর পৃথিবীতে ফিরে এসে শরীরের ভারসাম্য ও পেশিশক্তি পুনরুদ্ধারে নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। সেই গবেষণা থেকেই অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ট্রেডমিলের ধারণা জনপ্রিয়তা পায়।
শনিবার ব্রাজিল দলের মেডিকেল সেন্টারে এই ট্রেডমিলে অনুশীলন করতে দেখা যায় নেইমারকে। ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ভক্তদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তিনি পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠতে পারবেন।
এই প্রযুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো খেলোয়াড়কে পুরো শরীরের ওজন বহন করতে হয় না। একটি বিশেষ চেম্বারের মাধ্যমে শরীরের নিচের অংশে বায়ুচাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলে খেলোয়াড়ের কার্যকর ওজন কমে যায় এবং তিনি তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে দৌড়াতে পারেন।
বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাব এবং ক্রীড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফুটবল ছাড়াও বাস্কেটবল, টেনিস, অ্যাথলেটিকস এবং রাগবির মতো খেলায় চোটগ্রস্ত ক্রীড়াবিদদের পুনর্বাসনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ব্রাজিলের বেশ কয়েকটি ক্লাবও সম্প্রতি তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে খেলোয়াড়দের দ্রুত সুস্থ করে তোলার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। নেইমারের ক্ষেত্রেও সেই পথেই এগোচ্ছে ব্রাজিল দল।
বর্তমানে নেইমারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে তার শারীরিক অবস্থার নিয়মিত মূল্যায়ন। চিকিৎসকরা কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কারণ চোট পুরোপুরি না সেরে মাঠে ফিরলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যেতে পারে।
সোমবার তার নতুন করে ইমেজিং পরীক্ষা করার কথা রয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে কাফ পেশির বর্তমান অবস্থা বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মেডিকেল টিম পরবর্তী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবে।
চিকিৎসকদের মতে, পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ধৈর্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খেলোয়াড় যতই দ্রুত মাঠে ফিরতে চান না কেন, নির্ধারিত সময়ের আগে ফিরে আসা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই নেইমারের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে তিনি সীমিত শারীরিক অনুশীলন করছেন। এরপর ধীরে ধীরে দৌড়ের গতি ও সময় বাড়ানো হবে। শরীর ইতিবাচক সাড়া দিলে পরবর্তী ধাপে দলীয় অনুশীলনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
দলের সঙ্গে অনুশীলনে ফিরতে পারলে এরপর শুরু হবে বল নিয়ে কাজ। ফুটবলারের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। কারণ শুধুমাত্র দৌড়াতে পারা আর ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয়।
বল নিয়ন্ত্রণ, দিক পরিবর্তন, দ্রুত স্প্রিন্ট এবং ম্যাচ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয়গুলো মাঠে ফিরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মেডিকেল স্টাফ ও কোচিং স্টাফ যৌথভাবে তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তিও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নেইমারের উন্নতিতে তারা সন্তুষ্ট হলেও এখনও কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করা হবে না। দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে যা ভালো, সেটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আনচেলত্তির মতে, নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। তার উপস্থিতি পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তাই তাকে শতভাগ ফিট অবস্থায় পাওয়াই কোচিং স্টাফের মূল লক্ষ্য।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নেইমার খেলতে পারবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং পুনর্বাসনের অগ্রগতির ওপরই বিষয়টি নির্ভর করছে। তবে ব্রাজিল শিবিরে আশাবাদের পরিবেশ রয়েছে।
আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল। সেই ম্যাচে নেইমারকে পাওয়া গেলে দলের জন্য তা হবে বড় ধরনের শক্তি। অন্যদিকে তাকে ছাড়া খেলতে হলে বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখতে হচ্ছে কোচিং স্টাফকে।
ব্রাজিলের সমর্থকরাও প্রতিদিন তার ফিটনেস সংক্রান্ত খবর অনুসরণ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেইমারের অনুশীলনের ভিডিও লাখো মানুষ দেখছেন এবং তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন।
বিশ্বকাপের মতো আসরে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নকআউট পর্বে চাপের ম্যাচগুলোতে নেইমারের মতো তারকার অভিজ্ঞতা দলের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।
ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে হয়তো নেইমারের সামনে আর খুব বেশি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ নেই। তাই এবারের আসর তার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। নিজের শেষ দিকের বিশ্বকাপগুলোর একটিতে সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিতে মুখিয়ে আছেন তিনি।
এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর সোমবারের মেডিকেল রিপোর্টের দিকে। সেই রিপোর্টই বলে দেবে পুনর্বাসন কতটা সফল হয়েছে এবং বিশ্বকাপের শুরুতেই মাঠে নামার সম্ভাবনা কতটা উজ্জ্বল। আপাতত নাসা-প্রাণিত প্রযুক্তির সহায়তায় সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ব্রাজিলের এই মহাতারকা।
নেইমারের ফিটনেস নিয়ে প্রতিটি নতুন আপডেট তাই শুধু ব্রাজিল নয়, বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাকে দেখা যাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে এখন অপেক্ষা আর কিছুদিনের।



























