বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হার এড়াতে পারলেও সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পায়নি ব্রাজিল। মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্রয়ের পর ব্রাজিলের প্রথমার্ধের পারফরম্যান্সকে ২০১৪ সালের জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের দুঃস্বপ্নের পর সবচেয়ে বাজে ৪৫ মিনিট বলে আখ্যা দিয়েছেন দেশটির ফুটবল বিশ্লেষকরা।
ম্যাচের ফলাফল কাগজে-কলমে ব্রাজিলের জন্য খুব একটা খারাপ নয়। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকে অন্তত এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছেড়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে খেলার ধরণ, বিশেষ করে প্রথমার্ধে দলের অসহায় আত্মসমর্পণ সমর্থকদের হতাশ করেছে।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের শুরু থেকেই ছন্দহীন ছিল ব্রাজিল। বলের নিয়ন্ত্রণ, মাঝমাঠের সংগঠন এবং রক্ষণভাগের সমন্বয়—কোনো ক্ষেত্রেই নিজেদের সেরা রূপে দেখা যায়নি দলটিকে। মরক্কোর দ্রুতগতির আক্রমণের সামনে একাধিকবার দিশেহারা হয়ে পড়ে সেলেসাওরা।
তবে এই হতাশার মধ্যেও ব্রাজিলের জন্য উজ্জ্বল মুহূর্ত ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোল। ম্যাচের ৩২ মিনিটে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে দারুণ এক গোল করে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। কিন্তু সেই গোলের বাইরে প্রথমার্ধে ব্রাজিলের খেলার মধ্যে ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।
ব্রাজিলের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবোর কলামিস্ট ফার্নান্দো কালাস প্রথমার্ধের পারফরম্যান্স নিয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের লজ্জাজনক হারের পর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে খারাপ ৪৫ মিনিট ছিল মরক্কোর বিপক্ষে এই প্রথমার্ধ।
অবশ্য তিনি গোলসংখ্যার তুলনা করেননি। বরং প্রতিপক্ষের চাপের মুখে ব্রাজিল যেভাবে অসহায় হয়ে পড়েছিল, সেই দিকটি তুলে ধরেছেন। কালাসের মতে, খেলার ধরণ এবং মাঠে ব্রাজিলের দুর্বল উপস্থিতি ৭-১ ম্যাচের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।
পরিসংখ্যানও ব্রাজিলের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করেছে। ১৯৬৬ সালের পর মাত্র দ্বিতীয়বার কোনো দল ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটেই ব্রাজিলের গোলমুখে পাঁচটি শট নিতে সক্ষম হয়েছে। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন মরক্কো, যারা ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিলকে চাপে রেখেছিল।
ফার্নান্দো কালাস বিশেষভাবে সমালোচনা করেছেন কয়েকজন ফুটবলারের। তাঁর মতে, ইবানিয়েজ, ইগর থিয়াগো এবং কাসেমিরো প্রত্যাশার ধারেকাছেও যেতে পারেননি। তিনি মনে করেন, এই পারফরম্যান্সের পর আগামী ম্যাচে ইবানিয়েজ ও ইগর থিয়াগোকে শুরুর একাদশে দেখা নাও যেতে পারে।
একই সঙ্গে রাফিনিয়ার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই বিশ্লেষক। তাঁর মতে, ব্রাজিলের আক্রমণভাগে স্বয়ংক্রিয় পছন্দ হিসেবে রাফিনিয়ার জায়গা এখন আর নিশ্চিত নয়। কারণ মাঠে উপস্থিত থাকলেও ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
গ্লোবোর আরেক কলামিস্ট গুস্তাভো পোলিও ব্রাজিলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কোচ কার্লো আনচেলত্তি এখনো নিজের সেরা শুরুর একাদশ খুঁজে পাননি। ফলে দল নির্বাচনের কিছু সিদ্ধান্ত মাঠে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
পোলি বিশেষভাবে ইগর থিয়াগোর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য তাকে মাঠে নামানো হলেও তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। এমনকি ম্যাচে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগগুলোর একটিও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের খেলায় পরিবর্তন এসেছে বদলি খেলোয়াড়দের মাধ্যমে। ফাবিনিও মাঠে নেমে মাঝমাঠে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনেন এবং বলের নিয়ন্ত্রণে দলকে সহায়তা করেন। তাঁর উপস্থিতি ব্রাজিলকে আরও সংগঠিত করে তোলে।
পোলির মতে, ফাবিনিও কাসেমিরোর চেয়েও ভালো খেলেছেন। পাশাপাশি দানিলোর মাঠে আসা আক্রমণভাগে নতুন গতি যোগ করে। উইং দিয়ে ব্রাজিলের আক্রমণ আরও ধারালো হয়ে ওঠে এবং দল কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়।
লুকাস পাকেতার শুরুটাও ভালো ছিল না। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি ম্যাচে নিজের ছাপ রাখতে সক্ষম হন। অন্যদিকে রাফিনিয়া প্রচুর পরিশ্রম করলেও আক্রমণে কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা দেখাতে পারেননি।
মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শুরুর একাদশ নিয়ে। আনচেলত্তি পরবর্তী ম্যাচে পরিবর্তন আনবেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই। বিশেষ করে রক্ষণভাগ এবং মাঝমাঠে নতুন মুখ দেখার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারানো অবশ্য নতুন কিছু নয়। তবে ব্রাজিলের মতো শিরোপাপ্রত্যাশী দলের জন্য পারফরম্যান্সের মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মরক্কোর বিপক্ষে সেই পরীক্ষায় দলটি খুব একটা ভালো নম্বর পায়নি।
এখন ব্রাজিলের সামনে সুযোগ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর। আগামী ২০ জুন গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতির মুখোমুখি হবে সেলেসাওরা। সেই ম্যাচে জয় পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের হারানো আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে আনতে চাইবে কার্লো আনচেলত্তির দল।


























