চোট কাটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ম্যাচেই মাঠে ফিরতে পারেন ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার। এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ব্রাজিল জাতীয় দলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তার মতে, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং বিশ্বকাপের শুরুতেই দলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই অভিজ্ঞ ফুটবলারের।
শনিবার (৩০ মে) ব্রাজিলের তেরেসোপলিসে অবস্থিত গ্রাঞ্জা কোমারিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সামনে নেইমারের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কথা বলেন আনচেলত্তি। তিনি জানান, দলের মেডিকেল স্টাফ নিয়মিতভাবে নেইমারের পুনর্বাসন পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ব্রাজিল শিবিরে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো নেইমারের ফিটনেস। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ধরনের চোটে ভোগা এই তারকা মাঠের বাইরে থাকায় সমর্থকদের মধ্যেও ছিল উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি পায়ের পেশিতে চোট পাওয়ার কারণে বিশ্বকাপের আগে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে অংশ নিতে পারছেন না নেইমার। এতে করে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, বিশ্বকাপের শুরুর ম্যাচগুলোতেও তাকে হয়তো পাওয়া যাবে না।
তবে সেই শঙ্কা অনেকটাই উড়িয়ে দিয়েছেন কোচ আনচেলত্তি। তিনি বলেছেন, দলের মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী নেইমারের সুস্থতার অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি মাঠে ফেরার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেন।
আনচেলত্তি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি নেইমার খুব দ্রুতই ফিরে আসবে। যদি উদ্বোধনী ম্যাচে খেলতে না পারে, তাহলে দ্বিতীয় ম্যাচে অবশ্যই তাকে পাওয়া যাবে।” তার এই মন্তব্য ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। সেই ম্যাচে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ হবে মরক্কো, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য সহজ হবে না বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। ফলে এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নেইমারের মতো অভিজ্ঞ এবং সৃজনশীল খেলোয়াড়ের উপস্থিতি দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিতে পারে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিল দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে। প্রথম ম্যাচে রোববার (৩১ মে) ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে পানামার মুখোমুখি হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এরপর দলটি যুক্তরাষ্ট্রে উড়ে যাবে এবং নিউ জার্সিতে তাদের বিশ্বকাপ ক্যাম্প শুরু করবে। বিশ্বকাপের আগে নিজেদের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যেই সেখানে কয়েকদিন নিবিড় অনুশীলন করবে দল।
বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ৬ জুন। ওই ম্যাচে ক্লিভল্যান্ডে আফ্রিকার শক্তিশালী দল মিশরের বিপক্ষে মাঠে নামবে আনচেলত্তির শিষ্যরা।
চোটের কারণে পানামা ও মিশরের বিপক্ষে এই দুটি ম্যাচেই অনুপস্থিত থাকবেন নেইমার। যদিও দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়মিত রয়েছে এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমও অব্যাহত আছে।
প্রায় তিন বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দলে নেইমারের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ছিল। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি চোট ও ফর্মহীনতার সঙ্গে লড়াই করেছেন।
ব্রাজিলের অনেক সাবেক ফুটবলার এবং বিশ্লেষকও তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের মতে, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারত।
অন্যদিকে নেইমারের সমর্থকদের দাবি ছিল ভিন্ন। তারা মনে করেন, বড় টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্যের কারণে তাকে বাদ দেওয়া সম্ভব ছিল না।
কার্লো আনচেলত্তিও সম্ভবত সেই বিশ্বাস থেকেই তাকে দলে রেখেছেন। ইতালিয়ান এই কোচ মনে করেন, পুরোপুরি ফিট না থাকলেও নেইমারের মতো খেলোয়াড় যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন।
ব্রাজিলের বর্তমান দলে তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, এন্দ্রিকদের মতো তরুণ তারকাদের সঙ্গে নেইমারের উপস্থিতি দলকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে বেঞ্চের গভীরতা এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। সেই জায়গা থেকে নেইমারের প্রত্যাবর্তন ব্রাজিলের জন্য বড় ইতিবাচক খবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে চোটের কারণে বড় টুর্নামেন্টে ভুগতে হয়েছে নেইমারকে। ২০১৪ বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে শেষ পর্যায়ে খেলতে পারেননি, আর ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও ফিটনেস সমস্যা তাকে পুরোপুরি স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি।
তবুও জাতীয় দলের জার্সিতে তার অবদান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ব্রাজিলের হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণভাগের মূল ভরসা ছিলেন তিনি এবং অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে জিতিয়েছেন।
পরিসংখ্যানও তার পক্ষে কথা বলে। ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন নেইমার, যা তার অসাধারণ ধারাবাহিকতার প্রমাণ বহন করে।
এ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে ১২৮টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এসব ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ৭৯, যা ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি।
২০২৬ বিশ্বকাপ হবে নেইমারের ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ। এর আগে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ আসরে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি, যদিও শিরোপার স্বাদ এখনো পাননি।
ফলে এবারের বিশ্বকাপকে অনেকেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। বয়স, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতা বিবেচনায় এটিই হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ।
নেইমারকে ঘিরে ব্রাজিল সমর্থকদের প্রত্যাশাও তাই অনেক বেশি। তারা আশা করছেন, চোট কাটিয়ে দ্রুত মাঠে ফিরে এসে দলের শিরোপা জয়ের মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন এই তারকা।
এদিকে কোচ আনচেলত্তি বারবার জোর দিচ্ছেন দলগত ফুটবলের ওপর। তার মতে, ব্রাজিলের শক্তি শুধু একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না, তবে নেইমারের মতো তারকা থাকলে দলের মান স্বাভাবিকভাবেই আরও বেড়ে যায়।
বিশ্বকাপ শুরুর আর বেশি সময় বাকি নেই। এখন সব নজর নেইমারের পুনর্বাসন এবং তার ফিটনেস পরীক্ষার দিকে, কারণ ব্রাজিলের কোটি কোটি সমর্থক অপেক্ষা করছেন আবারও তাকে হলুদ জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে দেখার জন্য।


























