মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আবারও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইসরায়েলসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রশাসনের দাবি, এসব দেশের অনেকেই জোরপূর্বক শ্রমে (Forced Labor) তৈরি পণ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা এসব দেশের নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর করা হবে।
হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিত করা এবং জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এর পেছনে আরও বড় কারণ রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানো, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখা।
বিশেষ করে চীন থেকে আমদানি কমানোর নীতির ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের শুল্ক আরোপ করে আসছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত সেই নীতিরই সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী দেশগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে যেসব দেশের ওপর:
- চীন
- যুক্তরাজ্য
- জাপান
- ইসরায়েলসহ আরও কয়েকটি দেশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতে জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে কার্যকর আইন নেই বা যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে যেসব দেশের ওপর:
- ভারত
- শ্রীলঙ্কা
- ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোসহ এমন দেশ, যেখানে আইন থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।
সব ধরনের আমদানির ওপর এই অতিরিক্ত শুল্ক প্রযোজ্য হবে না। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও চুক্তিভিত্তিক আমদানিকে এই সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়েছে।
শুল্কমুক্ত থাকবে—
- ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তির আওতাভুক্ত পণ্য
- তেল ও গ্যাস
- কয়েকটি কৌশলগত শিল্পের নির্দিষ্ট আমদানি
এর ফলে উত্তর আমেরিকার আঞ্চলিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন শুল্ক শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিট (ওয়াশিংটন ডিসি সময়) থেকে কার্যকর হবে। এর আগে আরোপ করা অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন হার কার্যকর হবে।
ভারতের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মতে, ভারতে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য ঠেকাতে আইন রয়েছে। তবে সেই আইন বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। ফলে ভারত সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ শুল্কের তালিকায় পড়েনি।
এতে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়লেও চীনের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী থাকতে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।
চীনের জন্য ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দেশটির যুক্তরাষ্ট্রমুখী রপ্তানিকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে। বিশেষ করে—
- ইলেকট্রনিকস
- যন্ত্রপাতি
- ভোক্তা পণ্য
- শিল্প উপকরণ
এসব খাতে রপ্তানি ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কেন্দ্র অন্য দেশে স্থানান্তরের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে—
- আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) আবারও চাপে পড়তে পারে।
- আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
- বহু দেশের রপ্তানি আয় কমতে পারে।
- বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য আলোচনায় নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে নতুন করে বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ এই ঘোষণায় সরাসরি উচ্চ শুল্কের তালিকায় না থাকলেও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের কারণে পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। একদিকে কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করতে পারেন, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরগতির কারণে রপ্তানি চাহিদা কমার ঝুঁকিও রয়েছে।
নতুন শুল্কনীতির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও কঠোর বাণিজ্য অবস্থান নিয়েছে। চীন, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলো সর্বোচ্চ ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের মুখে পড়েছে, আর ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর জন্য শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং আগামী কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে।



























