দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের সব ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে দেশের তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের স্বত্ব অর্জন করেছে। ফলে দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর জন্য স্বস্তির খবর এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করবে বেসরকারি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল সময় টেলিভিশন। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং ক্রীড়াভিত্তিক চ্যানেল টি-স্পোর্টসও ম্যাচগুলো সম্প্রচার করবে। তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে সম্প্রচার স্বত্ব সংগ্রহ করেছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় ক্রীড়া আসর ঘিরে বাংলাদেশে দর্শকদের আগ্রহ সবসময়ই তুঙ্গে থাকে। বিশেষ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উন্মাদনা পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।
প্রথম দিকে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের সম্প্রচার অধিকার কিনেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সম্প্রচার স্বত্ব সংগ্রহ করলেও বাংলাদেশে তা বিক্রির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পায়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত তারা সেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
স্প্রিংবকের সরে দাঁড়ানোর পর দেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়। বিশ্বকাপ শুরুর দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে পর্যন্ত কোনো দেশীয় সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে করে দর্শকদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ফুটবলপ্রেমীরা জানতে চেয়েছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর তারা টেলিভিশনে দেখতে পারবেন কি না। অনেকে বিকল্প প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করার সম্ভাবনার কথাও আলোচনা করেন।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। সম্প্রচার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমন্বয় কার্যক্রম চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টার ফল মিলেছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালও সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় করেছেন।
তাদের উদ্যোগে দেশীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আলোচনা এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে সময় টেলিভিশন, বিটিভি এবং টি-স্পোর্টস যৌথভাবে সম্প্রচার স্বত্ব গ্রহণের ব্যাপারে একমত হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের পথ উন্মুক্ত করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ দর্শকদের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে। কারণ অনেক পরিবার এখনও টেলিভিশন সম্প্রচারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বিশ্বকাপ উপভোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনের গুরুত্ব অপরিসীম।
বিশ্বকাপের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে খেলা দেখেন। এটি শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং সামাজিক উৎসবের রূপ নেয়। ফলে সম্প্রচার নিশ্চিত হওয়ায় সেই উৎসবমুখর পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হবে বলে মনে করছেন ক্রীড়াপ্রেমীরা।
এদিকে বিশ্বকাপ সম্প্রচারে বিটিভির নিজস্ব কোনো অর্থ ব্যয় হচ্ছে না বলেও জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্প্রচার-সংক্রান্ত ব্যয় বহন করছে অংশীদার স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এবং টেলিকম অপারেটরগুলো। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়ছে না।
যৌথ উদ্যোগে গঠিত কনসোর্টিয়াম সম্প্রচার ব্যয়ের বিষয়টি সমন্বয় করছে। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরের সম্প্রচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও ভারসাম্যপূর্ণভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল এটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।
বিশ্বকাপ সম্প্রচারের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ায় বিজ্ঞাপন বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বিশ্বকাপ বিশ্বের অন্যতম বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আসর। ফলে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও উল্লেখযোগ্য দর্শকসংখ্যা পাওয়ার আশা করছে।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান প্রচারণামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। সম্প্রচার নিশ্চিত হওয়ার ফলে এসব কার্যক্রম আরও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দর্শকরাও নির্ভার হয়ে প্রিয় দলের খেলা উপভোগের প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আসর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন ফরম্যাটে আরও বেশি দল অংশগ্রহণ করায় প্রতিযোগিতাও হবে আরও আকর্ষণীয়। বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের লড়াই দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন কোটি কোটি সমর্থক।
বাংলাদেশের দর্শকরাও এবার ঘরে বসেই বিশ্বের সেরা এই ফুটবল উৎসব উপভোগ করতে পারবেন। সময় টেলিভিশন, বিটিভি ও টি-স্পোর্টসের মাধ্যমে টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ফলে বিশ্বকাপ ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এসেছে স্বস্তি ও আনন্দের বার্তা।



























