বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের অন্যতম আলোচিত ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ব্রাজিল ও মরক্কো। এই ম্যাচের প্রধান রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্লোভাকিয়ার অভিজ্ঞ ম্যাচ অফিসিয়াল স্লাভকো ভিনচিচ। তবে ম্যাচের আগে কয়েক বছর আগের একটি বিতর্কিত ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যেখানে মাদক ও পতিতাবৃত্তি চক্রের তদন্তে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
রোববার বাংলাদেশ সময় ভোরে অনুষ্ঠিতব্য এই ম্যাচকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ তুঙ্গে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কোর লড়াই এমনিতেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এর মধ্যেই ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া ভিনচিচকে ঘিরে পুরোনো বিতর্ক আবারও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
ফিফা ঘোষিত রেফারিং প্যানেল অনুযায়ী, স্লাভকো ভিনচিচের সঙ্গে সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন টোমাজ ক্লানচনিক ও আন্দ্রাজ কোভাচিচ। চতুর্থ রেফারি হিসেবে থাকবেন সুইজারল্যান্ডের সান্দ্রো শ্যারার এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন স্তেফান দে আলমেইদা।
ভিনচিচকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০২০ সালের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সে সময় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় একটি ব্যক্তিগত পার্টিতে পুলিশ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে মাদক, অস্ত্র এবং পতিতাবৃত্তি চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল।
অভিযানের সময় উপস্থিত থাকার কারণে স্লাভকো ভিনচিচকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই অভিযানে মোট ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছিল। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
তবে তদন্ত শেষে ভিনচিচের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগও আনা হয়নি। ফলে তিনি আইনি জটিলতা ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
পরে এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছিলেন ভিনচিচ। তিনি জানান, একটি ব্যবসায়িক সফরের অংশ হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়াটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত।
ভিনচিচ আরও দাবি করেন, অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের সঙ্গে তার কোনো পরিচয় ছিল না। তিনি কেবল একটি বৈঠক শেষে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনে তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
ঘটনাটির পর স্লোভেনিয়ান রেফারিজ অ্যাসোসিয়েশনও তার পাশে দাঁড়ায়। সংগঠনটির তৎকালীন সভাপতি ভ্লাদিমির সাইন ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেন, ভিনচিচ ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
বিতর্কিত সেই অধ্যায়ের পর নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন ভিনচিচ। ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালন করে তিনি আবারও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন। ফলে ফুটবল বিশ্বের আস্থা ফিরে পেতে তার খুব বেশি সময় লাগেনি।
২০২১ সালে তিনি ইউরোপা লিগের সেমিফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচেও তাকে দেখা গেছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বসহ আন্তর্জাতিক ফুটবলের একাধিক বড় ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার ঝুলিতে।
ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ লিগেও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন এই স্লোভাকিয়ান রেফারি। চাপের ম্যাচে শান্ত থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। ফিফা এবং উয়েফার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার উপস্থিতি সেই আস্থারই প্রতিফলন।
বর্তমানে ৪৬ বছর বয়সী ভিনচিচ আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম অভিজ্ঞ রেফারিদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন। তার ক্যারিয়ারে বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ যুক্ত হলেও বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দায়িত্ব পালন সবসময়ই বিশেষ মর্যাদার বিষয়।
ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার ম্যাচটিও বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্রাজিল তাদের হেক্সা মিশন শুরু করতে নামছে, অন্যদিকে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোও নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে প্রস্তুত।
এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্তও ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ভিনচিচের প্রতিটি সিদ্ধান্ত থাকবে কোটি কোটি দর্শকের নজরে। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই তিনি আবারও প্রমাণ করতে চাইবেন যে অতীতের বিতর্ক তার পেশাদারিত্বকে কখনোই প্রভাবিত করতে পারেনি।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে দায়িত্ব পাওয়া নিজেই একজন রেফারির জন্য বড় স্বীকৃতি। তাই ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে স্লাভকো ভিনচিচের ক্যারিয়ারে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি রেফারির পারফরম্যান্সও তাই থাকবে সমান আলোচনায়।























