ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলেই বাংলাদেশের কোটি সমর্থকের মধ্যে তৈরি হয় অন্যরকম উন্মাদনা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। টেলিভিশনের পাশাপাশি স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ল্যাপটপে সহজেই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকছে দর্শকদের জন্য। ফলে কর্মস্থলে, ভ্রমণে কিংবা ঘরের বাইরে থাকলেও প্রিয় দলের খেলা মিস করার আশঙ্কা নেই।
আধুনিক প্রযুক্তির কারণে খেলা দেখার ধরন দ্রুত বদলে গেছে। একসময় শুধুমাত্র টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে সরাসরি ম্যাচ উপভোগ করা সম্ভব। তাই বিশ্বকাপ ঘিরে মোবাইলভিত্তিক দর্শকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশের ফুটবলপ্রেমীরা ইতোমধ্যে নানা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। কেউ নতুন টেলিভিশন কিনছেন, কেউ আবার মোবাইল ডিভাইসে নিরবচ্ছিন্ন স্ট্রিমিং নিশ্চিত করতে ইন্টারনেট প্যাকেজ আপগ্রেড করছেন। কারণ বিশ্বকাপের উত্তেজনা থেকে এক মুহূর্তও দূরে থাকতে চান না সমর্থকরা।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের ম্যাচ সম্প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বরাবরের মতো এবারও দর্শকদের জন্য ম্যাচ সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। পাশাপাশি টি স্পোর্টস এবং সময় টেলিভিশনও সরাসরি খেলা দেখাবে।
এই চ্যানেলগুলো ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব সংগ্রহ করে দেশের দর্শকদের জন্য বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ নিশ্চিত করেছে। ফলে যেসব দর্শক টেলিভিশনের মাধ্যমে খেলা দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তারা সহজেই ঘরে বসে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারবেন।
তবে বর্তমান সময়ে শুধু টেলিভিশনের ওপর নির্ভরশীল দর্শকের সংখ্যা কমে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম স্মার্টফোনেই বেশি সময় কাটায়। তাই মোবাইলভিত্তিক লাইভ স্ট্রিমিং সেবার গুরুত্বও অনেক বেড়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কেবল বিকল্প মাধ্যম নয়, বরং অনেকের জন্য প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দ্রুত ইন্টারনেট এবং উন্নত ভিডিও প্রযুক্তির কারণে মোবাইল ফোনেও উচ্চমানের সম্প্রচার দেখা সম্ভব হচ্ছে। এতে দর্শকরা যেকোনো স্থান থেকে ম্যাচ উপভোগ করতে পারছেন।
বিশ্বকাপ দেখার জন্য বাংলাদেশে জনপ্রিয় কয়েকটি অ্যাপ ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সাবস্ক্রিপশন বা প্যাকেজের আওতায় সরাসরি ম্যাচ দেখা যাবে। ফলে ব্যবহারকারীরা সহজেই তাদের পছন্দের ডিভাইস ব্যবহার করে খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
মোবাইলে বিশ্বকাপ দেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি হলো মাই রবি অ্যাপ। রবি গ্রাহকরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে এই অ্যাপের মাধ্যমে ম্যাচের লাইভ স্ট্রিমিং দেখতে পারবেন। অ্যাপটি ব্যবহারবান্ধব হওয়ায় অনেক দর্শক এটিকে পছন্দ করেন।
এছাড়া টফি অ্যাপও বিশ্বকাপ দেখার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। দেশের ডিজিটাল কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে এটি ইতোমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বড় ক্রীড়া আয়োজনগুলোর লাইভ সম্প্রচার দেখার জন্য অনেক দর্শকের প্রথম পছন্দ টফি।
গ্রামীণফোন গ্রাহকদের জন্য বায়োস্কোপ অ্যাপও বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বায়োস্কোপ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট সম্প্রচার করে আসছে। ফলে বিশ্বকাপ উপলক্ষে অ্যাপটি দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
এসব অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত একটি সক্রিয় ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সাবস্ক্রিপশন বা ডেটা প্যাকেজ কিনতে হতে পারে। তাই খেলা শুরু হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়া ভালো।
বিশ্বকাপের সময় ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের সময় লাখো দর্শক একসঙ্গে লাইভ স্ট্রিমিংয়ে যুক্ত হন। ফলে অনেক সময় নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে দর্শকদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে, ম্যাচ শুরুর আগেই ইন্টারনেট সংযোগ পরীক্ষা করে নেওয়া। সম্ভব হলে উচ্চগতির ফোরজি বা ফাইভজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে ভালো অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে। ওয়াই-ফাই সংযোগ থাকলে সেটিও কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
লাইভ স্ট্রিমিংয়ের আরেকটি সুবিধা হলো দর্শকরা চলার পথে খেলা দেখতে পারেন। অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, গণপরিবহন কিংবা ভ্রমণের সময়ও স্মার্টফোনে খেলা দেখা সম্ভব। ফলে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত মিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
মোবাইলভিত্তিক সম্প্রচারে দর্শকরা অতিরিক্ত কিছু সুবিধাও পেয়ে থাকেন। অনেক প্ল্যাটফর্মে ম্যাচের হাইলাইটস, গুরুত্বপূর্ণ ক্লিপ এবং পুনঃসম্প্রচার দেখার সুযোগ থাকে। এতে খেলা মিস হলেও পরে সহজেই গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দেখা যায়।
বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি বৈশ্বিক বিনোদনের অন্যতম বড় আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একই ম্যাচ উপভোগ করেন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
দেশের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডের সমর্থক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশ্বকাপের সময় এসব দলের জার্সি, পতাকা এবং নানা আয়োজন চোখে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
বিশ্বকাপ সম্প্রচারের স্বত্ব অর্জন করাও একটি বড় বিনিয়োগের বিষয়। জানা গেছে, এবারের বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ৩০ থেকে ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩৭ কোটি থেকে ৪৯ কোটিরও বেশি।
এত বড় বিনিয়োগের লক্ষ্য একটাই—দেশের দর্শকদের কাছে বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত পৌঁছে দেওয়া। টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। ফলে দর্শকরাও পাচ্ছেন আরও বেশি বিকল্প।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ক্রীড়া সম্প্রচারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব আরও বাড়বে। তরুণ দর্শকদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই মোবাইলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। তাই স্ট্রিমিং সেবার গুরুত্ব ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজন সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। যেখানে একই ম্যাচ টেলিভিশন, মোবাইল, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারে একসঙ্গে দেখা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির এই অগ্রগতি দর্শকদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ উপভোগ করতে টেলিভিশন কিংবা মোবাইল—দুই মাধ্যমই দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকছে। যারা ঘরে বসে খেলা দেখতে চান তারা টিভিতে দেখতে পারবেন, আর যারা বাইরে থাকবেন তারা স্মার্টফোনেই উপভোগ করতে পারবেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের প্রতিটি মুহূর্ত।
ফুটবলের ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে পরিচিত এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে বাংলাদেশের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এখন তুঙ্গে। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের নাটকীয়তা, তারকাদের পারফরম্যান্স এবং বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে প্রস্তুত দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমী। এবার তাই খেলা দেখার জন্য শুধু একটি মোবাইল ফোন এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগই হতে পারে সবচেয়ে বড় সঙ্গী।


























