বিশ্বের বৃহত্তম জাতীয় উদ্যান উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ড ন্যাশনাল পার্কের সমুদ্রে প্রথমবারের মতো জীবিত অবস্থায় প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখা গেছে বিরল আর্কটিক ববটেইল স্কুইড (Rossia moelleri)। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী স্কুইডের আশপাশে ডিমের গুচ্ছও দেখতে পেয়েছেন। গবেষকদের মতে, এটি আর্কটিক অঞ্চলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার।
বিরল আবিষ্কারে উচ্ছ্বসিত বিজ্ঞানীরা
সম্প্রতি Polar Biology জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, আর্কটিক ববটেইল স্কুইডকে এর প্রাকৃতিক আবাসে আগে কখনও দেখা যায়নি।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার গভীর সমুদ্রবিষয়ক জীববিজ্ঞানী পেইজ মারোনি বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্যান হলেও উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে এখনো খুব কম তথ্য রয়েছে। এই আবিষ্কার সেই তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে।
পানির নিচের রোবটেই মিলল বিরল প্রাণী
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত Polar BLAST (Baseline, Life and Structure of the Arctic) গবেষণা অভিযানের সময় বিজ্ঞানীরা পানির নিচে রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল (ROV) ও বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করেন।
প্রায় ৫০ মিটার গভীরে, যেখানে পানির তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেখানে তারা একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী আর্কটিক ববটেইল স্কুইড এবং তার পাশে শক্ত পাথরের সঙ্গে সংযুক্ত তিনটি ডিমের গুচ্ছ দেখতে পান।
আর্কটিকের কঠিন পরিবেশেও সফল প্রজনন
গবেষকদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে যে আর্কটিকের বরফশীতল ফিয়র্ডেও ববটেইল স্কুইড সফলভাবে প্রজনন করছে।
তাদের ভাষায়, এত কম তাপমাত্রায় ডিম দেওয়া এবং বেঁচে থাকা এই প্রজাতির অভিযোজন ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ
স্কুইডের জীবনচক্র তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনের প্রভাবও দ্রুত তাদের ওপর পড়ে।
গবেষকদের মতে—
- সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি
- পানির লবণাক্ততার পরিবর্তন
- খাদ্যের প্রাপ্যতা
এসব বিষয় স্কুইডের প্রজনন ও টিকে থাকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ধরনের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হওয়া অঞ্চলে নতুন তথ্য
আর্কটিক বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে খুব কম গবেষণা হওয়া এলাকাগুলো থেকে পাওয়া প্রতিটি নতুন তথ্য বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। গবেষকদের মতে, একটি মাত্র নিশ্চিত পর্যবেক্ষণও ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় সহায়তা করেছে বিশেষ অভিযান
আর্কটিকে গবেষণা পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এই অভিযানে Secret Atlas এবং Yachts for Science-এর সহায়তা নেন।
বেসরকারি অভিযানের ইয়টকে গবেষণা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হন, যেখানে সাধারণ গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে যাওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না।
শেষ কথা
প্রথমবার প্রাকৃতিক পরিবেশে আর্কটিক ববটেইল স্কুইড ও তার ডিমের গুচ্ছের সন্ধান শুধু একটি বিরল প্রাণী দেখার ঘটনা নয়; এটি আর্কটিকের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, প্রজনন আচরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও গবেষণা আর্কটিকের অজানা সামুদ্রিক জগত সম্পর্কে নতুন তথ্য উন্মোচন করবে।




























