বিদেশি ঋণে নেওয়া সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থে রাজধানীর মিরপুরে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এই নির্মাণকাজে কাটা হয়েছে বহু পুরোনো গাছ, ভরাট করা হয়েছে পুকুর। ভবনগুলোতে সুইমিংপুল, জিম, বিলাসী স্যুটসহ নানা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হচ্ছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
প্রকল্পটির নাম ‘সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২’। মূলত টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে এই প্রকল্পে গবেষণাগার উন্নয়নের নামে যুক্ত করা হয় একাধিক ভবন নির্মাণ এবং বিলাসী অবকাঠামো।
মিরপুরের পাইকপাড়ায় সড়ক গবেষণাগার এলাকায় এসব ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এলাকাটি গাছপালায় ঘেরা শান্ত পরিবেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন সেখানে বড় বড় ভবনের নির্মাণকাজের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের জন্য বহু পুরোনো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এছাড়া একটি পুকুরও ভরাট করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অংশ ছিল। পরিবেশবাদীরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে ভবনগুলোর ভেতরের আয়োজন। প্রকল্পে রাখা হয়েছে মাল্টিপারপাস হল, সেমিনার হল, কনফারেন্স হল, লাউঞ্জ এবং প্রায় দেড় শতাধিক আধুনিক কক্ষ। এসব কক্ষকে পাঁচতারকা হোটেলের মানের আবাসন হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া ভবনে সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, ইনডোর গেমস, বিলিয়ার্ড, স্নুকার ও কার্ড রুমের মতো সুবিধাও রাখা হয়েছে। সরকারি সড়ক প্রকল্পে এমন বিলাসী উপকরণ যুক্ত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে।
প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরুতে এসব ভবন ও যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
প্রথম দিকে কাজটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৩২ কোটি টাকা। তবে পরে তিন দফায় ব্যয় বাড়ানো হয়। বর্তমানে এই অংশের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩৫ কোটি টাকায়, যা শুরুতে নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি।
সওজের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে সওজের প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ কম দামে কাজ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এতে তারা সহজেই কাজটি পেয়ে যায়।
কিন্তু পরে দেখা যায়, যেসব উপকরণের দাম কম দেখিয়ে দরপত্র নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে নতুন নতুন কাজ ও পণ্য যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর ব্যয় অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মূলত বাড়তি মুনাফা অর্জনের জন্যই এ ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ব্যয় বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাওয়ার পর বিভিন্ন সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। সরকারি প্রকল্পে এমন ব্যয় বৃদ্ধি অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
নির্মাণাধীন এলাকাটিতে আগে বেশ কিছু পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর ভবন ছিল। এসব ভবনের নকশা করেছিলেন দেশের খ্যাতিমান স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সেই ভবনগুলোও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
স্থাপত্যবিদ ও সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঐতিহ্যবাহী নকশার এসব ভবন সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। উন্নয়নের নামে দেশের স্থাপত্য ঐতিহ্য ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।
এদিকে বর্তমান সরকার সারা দেশে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে। বিভিন্ন সময় সরকারি উদ্যোগে গাছ লাগানোর কর্মসূচিও পালন করা হচ্ছে। কিন্তু একই সরকারের একটি সংস্থার মাধ্যমে গাছ কেটে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের ঘটনায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বড় গাছ ও জলাধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ধ্বংস করে কংক্রিটের অবকাঠামো নির্মাণ করলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়বে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলাসী উপকরণ সংযোজনের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা উচিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণে নেওয়া প্রকল্পের অর্থ অপচয় হলে শেষ পর্যন্ত এর বোঝা জনগণকেই বহন করতে হয়। তাই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে এলাকাটি ছিল শান্ত ও সবুজে ঘেরা। এখন সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি, ধুলাবালি ও নির্মাণকাজের কারণে পরিবেশের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। তারা দ্রুত বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সওজের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পের বিভিন্ন পরিবর্তন যথাযথ অনুমোদনের মাধ্যমেই করা হয়েছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে কেন পাঁচতারকা মানের কক্ষ, সুইমিংপুল কিংবা বিলাসী বিনোদন সুবিধা প্রয়োজন হলো। তারা মনে করছেন, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা ও প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। জনগণের করের অর্থ কিংবা বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবহার করে বিলাসী অবকাঠামো নির্মাণ জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সব মিলিয়ে সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২–এর আওতায় মিরপুরে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ এখন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশ ধ্বংস ও বিলাসী সুবিধা সংযোজন নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।





























