সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য খাতে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশটির ৩১টি অঙ্গরাজ্যে এই অণুবীক্ষণিক পরজীবীর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি সাইক্লোস্পোরিয়াসিস নামে পরিচিত একটি অন্ত্রের সংক্রমণ, যার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো ঘন ঘন পানির মতো পাতলা পায়খানা বা তীব্র ডায়রিয়া। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সতর্কতা জোরদার করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত অন্তত ৮৪৩ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি আরও দেড় হাজারের বেশি সম্ভাব্য সংক্রমণের ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮০ জনের বেশি রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। যদিও স্বস্তির বিষয় হলো, এ রোগে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সেখানে এক হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গেছে নিউইয়র্ক, ওহাইও এবং ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি হিসাবের বাইরে আরও অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন, কারণ অনেকেই হালকা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেন না বা পরীক্ষা করান না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ একটি খাদ্যবাহিত রোগ। এটি সাধারণত দূষিত ফল, শাকসবজি অথবা দূষিত পানি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সংক্রমণ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আরেকজনের শরীরে সরাসরি ছড়ায় না। ফলে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
রোগটির লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের এক সপ্তাহ পর দেখা দেয়। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া। এছাড়া পেটব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া এবং শরীরে পানিশূন্যতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা না নিলে উপসর্গ কয়েক দিন থেকে এক মাসের বেশি সময় পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ কমে যাওয়ার পর আবারও ফিরে আসতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সংক্রমণের নির্দিষ্ট উৎস নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে অতীতের বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে প্যাকেটজাত সালাদ, ধনেপাতা, তুলসী পাতা, রাস্পবেরি, স্প্রিং অনিয়ন এবং অন্যান্য কাঁচা শাকসবজির সঙ্গে এই পরজীবীর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, কৃষিজমিতে দূষিত সেচের পানি ব্যবহারের মাধ্যমে এসব খাদ্যদ্রব্যে পরজীবী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মিশিগান স্বাস্থ্য বিভাগ রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে। তারা শাকসবজি ভালোভাবে ধোয়া, সম্ভব হলে রান্না করে খাওয়া এবং খাদ্য প্রস্তুতের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে। যদিও FDA জানিয়েছে, শুধু পানি দিয়ে ধুলেই এই পরজীবী পুরোপুরি দূর হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। তারপরও পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধোয়ার অভ্যাস ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, যাদের দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, তাদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে সাইক্লোস্পোরা সংক্রমণ শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সংক্রমণের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ নতুন নতুন তথ্য নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে এবং অনেক সম্ভাব্য সংক্রমণ এখনো পরীক্ষাধীন রয়েছে। তাই কাঁচা ফল ও সবজি খাওয়ার আগে ভালোভাবে পরিষ্কার করা, নিরাপদ পানি পান করা এবং দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়াকে অবহেলা না করার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।























