ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের সূচনা করল ডেনমার্কভিত্তিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নোভো নরডিস্ক। সংস্থাটি ভারতে বিশ্বের প্রথম সপ্তাহে মাত্র একবার নেওয়া যায় এমন বেসাল ইনসুলিন ‘আউইকলি’ (Awiqli) বা ইনসুলিন আইকোডেক (Insulin Icodec) চালু করেছে। টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি এই ইনসুলিনের মাধ্যমে প্রতিদিন ইনজেকশন নেওয়ার পরিবর্তে সপ্তাহে মাত্র একবার ইনজেকশন নিলেই চলবে। ফলে বছরে ৩৬৫টি ইনজেকশনের পরিবর্তে মাত্র ৫২টি ইনজেকশনই যথেষ্ট হবে।
বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন ইনসুলিন নেওয়ার ঝামেলা, ইনজেকশনের ভয় এবং চিকিৎসা নিয়ম মেনে চলতে না পারার সমস্যায় ভোগেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন সাপ্তাহিক ইনসুলিন সেই সমস্যাগুলো অনেকটাই কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কী এই আউইকলি (Awiqli)?
আউইকলি হলো দীর্ঘ-কার্যকরী (Long-acting) বেসাল ইনসুলিন, যার জেনেরিক নাম ইনসুলিন আইকোডেক। এটি শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকে, ফলে প্রতিদিন ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
এই ইনসুলিন মূলত—
- টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য
- টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নিয়মিত ইনসুলিন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক রোগী প্রতিদিন ইনজেকশন নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হয়।
সাপ্তাহিক ইনসুলিনের সম্ভাব্য সুবিধাগুলো হলো—
- বছরে ইনজেকশনের সংখ্যা ৩৬৫ থেকে কমে ৫২-তে নেমে আসবে।
- ইনজেকশন-ভীতি অনেকটাই কমবে।
- চিকিৎসা নিয়ম মেনে চলার হার বাড়তে পারে।
- রোগীর দৈনন্দিন জীবন আরও সহজ হবে।
- দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতে কত দামে মিলবে?
নোভো নরডিস্ক জানিয়েছে, আউইকলি দুটি ভ্যারিয়েন্টে বাজারে আনা হয়েছে।
মূল্য তালিকা:
- ১ মিলি (৭০০ ইউনিট) পেন – ২,৬১১ টাকা
- ৩ মিলি (২,১০০ ইউনিট) পেন – ৭,৮৩৩ টাকা
- ৭০ ইউনিটের সাপ্তাহিক ডোজের আনুমানিক মূল্য – ২৬১ টাকা
তবে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ডোজ নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক।
ভারতে কেন এই ওষুধের চাহিদা বাড়তে পারে?
নোভো নরডিস্কের তথ্য অনুযায়ী—
- ভারতে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
- আরও প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন।
- বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ইনসুলিন থেরাপি নিচ্ছেন।
- ভবিষ্যতে এই সংখ্যা বেড়ে ৯০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে কোম্পানির আশা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনজেকশনের ভয়, সম্ভাব্য ব্যথা এবং খরচের কারণে ভারতে অনেক রোগী ইনসুলিন শুরু করতে গড়ে ৭ থেকে ৯ বছর দেরি করেন। নতুন সাপ্তাহিক ইনসুলিন এই মানসিক বাধা কিছুটা কমাতে পারে।
বিশ্বজুড়ে অনুমোদন
নোভো নরডিস্ক জানিয়েছে, ইনসুলিন আইকোডেক ইতোমধ্যে—
- যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন পেয়েছে।
- ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে অনুমোদিত।
- আরও কয়েকটি দেশে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
- ভারত এই ইনসুলিন চালু করা বিশ্বের সপ্তম দেশ।
ইনসুলিন বাজার আরও বড় হবে
বাজার গবেষণা সংস্থা IMARC-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ইনসুলিনের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে—
- ২০২৫ সালে ভারতের ইনসুলিন বাজারের আকার প্রায় ৬৬০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
- ২০৩৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯১৬.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
- অলস জীবনযাপন
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- স্থূলতা
- বংশগত ঝুঁকি
- ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
সাপ্তাহিক ইনসুলিন বাজারে এলেও এটি সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। কোন রোগীর জন্য এটি নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তাই নিজে থেকে ইনসুলিন পরিবর্তন বা নতুন ইনসুলিন শুরু করা উচিত নয়।
এক নজরে
- বিশ্বের প্রথম সাপ্তাহিক বেসাল ইনসুলিন চালু হয়েছে ভারতে।
- ওষুধটির নাম আউইকলি (ইনসুলিন আইকোডেক)।
- সপ্তাহে মাত্র ১ বার ইনজেকশন নিতে হবে।
- টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনুমোদিত।
- বছরে ৩৬৫টি ইনজেকশনের পরিবর্তে মাত্র ৫২টি ইনজেকশন যথেষ্ট।
- ১ মিলি পেনের দাম ২,৬১১ টাকা এবং ৩ মিলি পেনের দাম ৭,৮৩৩ টাকা।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ইনসুলিন ব্যবহার বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

























